কুমিল্লায় ‘সিরিয়াল কিলার’ মানিক গ্রেপ্তার;
মোঃ মাসুদ রানা;
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
কুমিল্লায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের টার্গেট করে হত্যার অভিযোগে আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিককে গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের দাবি, মানিককে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে নাঙ্গলকোটের অটোরিকশাচালক মেহেদী (১৮), নিখোঁজ অটোরিকশাচালক আরমান হোসেন (১৫) এবং এর আগে লাকসামের অটোরিকশাচালক শাহজাহান সাইমন (১৭) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড ঘটাতেন মানিক। এ কারণে জেলা পুলিশ তাঁকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে উল্লেখ করছে।
গত ১২ আগস্ট নাঙ্গলকোট থানার আতিয়াবাড়ী এলাকায় একটি অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে মরদেহটি অটোরিকশাচালক মো. মেহেদীর বলে শনাক্ত করা হয়। এ ঘটনায় নাঙ্গলকোট থানায় হত্যা মামলা হলে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান, পিপিএমের নির্দেশে থানা পুলিশের পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আব্দুল ওয়াদুদ ওরফে মানিক, শাহেদ, ফাহিম ও সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মেহেদীকে হত্যার পর তাঁর অটোরিকশা ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেন। মানিক ও সেলিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
আরমানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার
মেহেদী হত্যা মামলার তদন্তের সময় মানিকের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন জব্দ করে পুলিশ। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, ফোনটি মানিকের নয়; এটি গত ২৪ জুলাই নিখোঁজ হওয়া অটোরিকশাচালক আরমান হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন।
আরমান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাঁর মামা নাঙ্গলকোট থানায় মামলা করেন। তদন্তে আরমানের চালানো অটোরিকশার কাটা অংশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জোবায়ের হোসেন সুজন, নূর আলম ও গিয়াস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, অটোরিকশাটি মানিক ও সেলিমের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তাঁদেরও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ডোবা থেকে কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য
এরই মধ্যে গত ১২ সেপ্টেম্বর মনোহরগঞ্জ থানার বিনয়ঘর এলাকায় একটি ডোবা থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মনোহরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা হয়। পরে মানিকের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোন এবং গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পান তদন্তকারীরা।
পুলিশ জানায়, আরমান অপহরণ মামলায় মানিক ও সেলিমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা আরমানকে হত্যার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে মনোহরগঞ্জের বিনয়ঘর এলাকার একটি ডোবায় ফেলে দেওয়ার কথা জানান।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর মানিক আদালতে আরমানকে হত্যার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
আগেও অটোরিকশাচালক হত্যার অভিযোগ
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগেও ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে শাহজাহান সাইমন (১৭) নামে এক অটোরিকশাচালককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে মানিকের বিরুদ্ধে।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে কাপড়ে পেঁচিয়ে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানাপ্রাচীরের পাশে একটি পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে ফেলে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় লাকসাম থানায় হত্যা মামলা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর মানিক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চালকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
কুমিল্লা জেলা পুলিশের দাবি, মানিক মূলত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালকদের টার্গেট করতেন। অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পাশাপাশি চালকদের হত্যার ঘটনাতেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। এ কারণে পুলিশ তাঁকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে উল্লেখ করছে।
একাধিক অটোরিকশাচালক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একই ব্যক্তির নাম উঠে আসায় জেলার অটোরিকশাচালকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতে নির্জন এলাকায় যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে চালকদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য এখনো আদালতে বিচারাধীন বিষয়। আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে কার কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo