অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ: গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক;
৭ম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শোষণ-বঞ্চনার অবসান এবং একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হলেও মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতে নিয়ে আসে।
১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের সময় তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলেও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি।
মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর আহ্বানে ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের বহু নেতা-কর্মী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান দেবিদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামের বাড়িতেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন এবং জাতিসংঘেও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই থেকে ‘নতুন বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের নানা বিষয় তুলে ধরা হতো।
স্বাধীনতার পরও গণতন্ত্রের সংগ্রামে
স্বাধীনতার পরও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের কল্যাণ। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি লেখালেখিতেও তাঁর আগ্রহ ছিল। ‘সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা’, ‘কিছু কথা’, ‘মুক্তির পথ’ ও ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’সহ তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত করলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
চিরবিদায়
২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৭ বছর বয়সে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সর্বস্তরের মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজ জন্মভূমি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে সংগ্রাম করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাঁর অবদান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
তাঁর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর রাজনৈতিক জীবন, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন ও সংগ্রাম থেকে দেশ, গণতন্ত্র এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রেরণা গ্রহণ করবে—এটাই প্রত্যাশা।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
মোঃ মাসুদ রানা
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo