মরন ফঁাদে পরিণত মোহনপুরের নাকইল-গোপাইল শিব নদী ফুটব্রিজ;
মোঃ নাসিরউদ্দিন ;সটাফ রিপোর্টার ;
উদ্বোধনের দীর্ঘ দেড় দশক (১৫ বছর) পার হয়ে গেলেও সামান্য সংস্কার কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের ছোঁয়া লাগেনি রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার নাকইল ও গোপাইল গ্রাম সংযোগকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিব নদীর ফুটব্রিজটিতে। বিগত সরকারের সময়ে কেবল খাতাকলমে নামমাত্র সংস্কার দেখানো হলেও দুই পাশের প্রধান সংযোগ সড়কগুলোর করুণ দশা কাটেনি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অ্যাপ্রোচ রোডের ধসে পড়ার কারণে ব্রিজটি এখন পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন চরম ক্ষোভ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই জরাজীর্ণ ব্রিজ দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে।
উদ্বোধনের ইতিহাস ও আশার নিভে যাওয়া
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর (২৬ আশ্বিন ১৪১৮ বাংলা) তৎকালীন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মরহুম মোহাম্মদ মেরাজ উদ্দিন মোল্লা এই ফুটব্রিজটির শুভ উদ্বোধন করেছিলেন। উদ্বোধনের পর শিব নদী পারাপারে নাকইল, গোপাইলসহ পার্শ্ববর্তী অন্তত ১০-১২টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় এবং স্থানীয়দের মাঝে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে।
তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দেড় যুগে প্রবেশ করলেও পর্যায়ক্রমে নতুন করে কোনো আধুনিকায়ন কিংবা টেকসই সংস্কার করা হয়নি ফুটব্রিজটিতে। সময়ের বিবর্তনে নদীর পানির তোড় ও প্রাকৃতিক দূর্যোগে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ব্রিজের পাটাতন ও মূল কাঠামো। তার ওপর ব্রিজের দুই পাশের সংযোগ সড়কের মাটি ধসে তৈরি হয়েছে বিশাল গর্ত, যার ফলে একসময় যে ব্রিজে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করত, আজ তা রূপ নিয়েছে মরণফাঁদে।
শিক্ষার্থী ও পথচারীদের চরম ভোগান্তি
ফুটব্রিজটির করুণ দশায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। নদীর দুই পাড়ে অবস্থিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। বৃষ্টি বা বর্ষার সময়ে পিচ্ছিল নড়বড়ে ব্রিজে সাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটে নদী পার হতে গিয়ে প্রায়শই ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। শিব নদীর দুই পাড়ের উৎপাদিত কাঁচা কৃষি পণ্য বাজারে নিতে গিয়ে তাদের চরম বিপাকে পড়তে হয়। সবচেয়ে করুণ অবস্থা সৃষ্টি হয় রাতে কিংবা জরুরি কোনো রোগী পারাপারের ক্ষেত্রে। কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা ছোট যানবাহন চলাচলের উপায় না থাকায় আশঙ্কাজনক রোগীদের অনেক ঘুরে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা
এলাকাবাসী অভিযোগ করে জানান, প্রতিটি নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা স্থায়ী সেতু ও সড়ক মেরামতের নানা আশ্বাস দিলেও ভোটের পর তা আর বাস্তবায়িত হয় না। সরকারি বরাদ্দের দোহাই দিয়ে নামমাত্র কিছু বালুর বস্তা ফেলা বা সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে এক স্থানীয় অধিবাসী বলেন:
"দেড় দশক আগে ফুটব্রিজটি হওয়ার পর আমরা কত খুশি হয়েছিলাম! কিন্তু আজ এই ব্রিজের পারাপার হওয়া মানে জীবনের সাথে ঝুঁকি নেওয়া। প্রতিদিন শিশুদের হাত ধরে ভয়ে ভয়ে নদী পার করাতে হয়। সেতুটি এখন পুরোপুরি অকেজো।"
অবিলম্বে স্থায়ী সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের জোর দাবি—এই জরাজীর্ণ ও বিপদজনক ফুটব্রিজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত একটি স্থায়ী, প্রশস্ত পাকা সেতু নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি অনতিবিলম্বে নাকইল-গোপাইল সংযোগ সড়কটি টেকসইভাবে সংস্কার ও পাকা করা প্রয়োজন।
জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি (LGED) এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই মরণফাঁদে পরিণত হওয়া ফুটব্রিজটি পরিদর্শন করে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই এখন দুই পাড়ের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের আকুল আকুতি।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo