মোঃ মাসুদ রানা, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
কুমিল্লা: সবুজ ঘাসে ঘেরা প্রাঙ্গণ, সারি সারি সাদা সমাধিফলক আর নীরব পরিবেশ—দূর থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ কোনো কবরস্থান। কিন্তু প্রতিটি সমাধিফলকের পেছনে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করুণ ইতিহাস। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পাশেই অবস্থিত ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ইংরেজ কবরস্থান’ নামে। এটি শুধু সমাধিস্থল নয়, বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি ও মানবিক বেদনার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) সীমান্তে মিত্রবাহিনী ও জাপানি বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসব যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি অন্যতম।
কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, বুড়িচং উপজেলার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় চার একর জায়গাজুড়ে এ সমাধিক্ষেত্র অবস্থিত। পরিচ্ছন্ন সবুজ মাঠ, গাছপালা ও সুশৃঙ্খল সমাধিফলক পুরো এলাকাকে শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশে ঘিরে রেখেছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখানে যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন, অবিভক্ত ভারতের ১৭১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের চারজন এবং রোডেশিয়ার তিনজনসহ বিভিন্ন দেশের সৈন্যদের সমাহিত করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক হিসাব অনুযায়ী, একসময় এখানে মোট ৭৩৭টি সমাধি ছিল।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ২৪ জন জাপানি সৈন্যের দেহাবশেষ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পর বাসসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সমাধির সংখ্যা ৭১৩টি। এসব সমাধিফলকে সৈন্যদের নাম, পদবি, মৃত্যুর তারিখ এবং কোথাও কোথাও স্বজনদের স্মৃতিবিজড়িত কথাও লেখা রয়েছে।
এখানে সমাহিত অনেক সৈন্যের বয়স ছিল খুবই কম। কেউ কেউ মাত্র ১৮ বা ১৯ বছর বয়সে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন, আবার অনেকে যুদ্ধকালীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। প্রতিটি সমাধিফলক যেন একটি পরিবারের হারানোর বেদনা এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার নীরব সাক্ষ্য বহন করছে।
স্থানীয়ভাবে ‘ইংরেজ কবরস্থান’ নামে পরিচিত হলেও এখানে শুধু ব্রিটিশ সৈন্যদের সমাধি নেই। বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সৈন্যদের সমাধি রয়েছে। ফলে এটি আন্তর্জাতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি রক্ষণাবেক্ষণ করে কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন (সিডব্লিউজিসি)। প্রতিবছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এখানে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে কমনওয়েলথভুক্ত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও কূটনীতিকেরা যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
শিক্ষার্থী, ইতিহাসপ্রেমী ও দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরা এই সমাধিক্ষেত্র দেখতে আসেন। তাঁদের কাছে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস জানার পাশাপাশি শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
কুমিল্লার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও সংরক্ষিত সমাধিফলক দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটাতে এ ধরনের স্থানের পরিচিতি বাড়ানো এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন।
যুদ্ধের বিভীষিকা, স্বজন হারানোর বেদনা এবং শান্তির প্রয়োজনীয়তা—সবকিছুরই নীরব স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুমিল্লার এই ‘ইংরেজ কবরস্থান’। সময়ের পরিক্রমায় এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠশালা।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo