তিন গম্বুজ, ১২ মিনার ও সুফি সাধকের মাজার ঘিরে ইসলামী ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন;
মোঃ মাসুদ রানা, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ এলাকায় ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহাসিক দারোগা বাড়ি মসজিদ। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, তিনটি গম্বুজ, ১২টি মিনার এবং পুরু দেয়ালের নির্মাণরীতি মসজিদটিকে কুমিল্লার অন্যতম ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনা হিসেবে পরিচিত করেছে।
রাজগঞ্জ বাজারের ব্যস্ততা পেরিয়ে ইউসুফ স্কুলের পাশ দিয়ে শাহ গাজীপুরী রোডে এগোলেই দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদের। মসজিদের পাশেই রয়েছে সুফি সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মাজার শরিফ। ফলে মসজিদ ও মাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষের যাতায়াত রয়েছে।
প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১২১১ থেকে ১২১৪ হিজরির মধ্যবর্তী সময়ে রিয়াজউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নামের এক বুজুর্গ ব্যক্তি দারোগা বাড়ি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় সামান্য পার্থক্য থাকলেও এটি প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো স্থাপনা—এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী বর্ণনা রয়েছে।
চুন-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটির দেয়াল তিন ফুটেরও বেশি পুরু বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়। তিনটি গম্বুজ ও ১২টি মিনার এর স্থাপত্যশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। আধুনিক স্থাপত্যের ভিড়ে প্রাচীন নির্মাণরীতির এ নিদর্শন এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
দারোগা বাড়ি মসজিদের পাশেই রয়েছে হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মাজার শরিফ। স্থানীয় ও প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে ভারতের কানপুর থেকে আগত একজন সুফি সাধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ইসলামের প্রচার ও মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাঁর নাম স্থানীয় ঐতিহ্যের বর্ণনায় যুক্ত রয়েছে। তাঁর মাজারকে ঘিরেও ধর্মপ্রাণ মানুষের শ্রদ্ধা ও আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে শুক্রবার ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষে এখানে মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে।
কুমিল্লা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত শহর। কবির জীবনের বিভিন্ন সময়ের স্মৃতি, যাতায়াত ও সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা অধ্যায়ের সঙ্গে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থান জড়িয়ে রয়েছে। দারোগা বাড়ির সঙ্গেও কবির স্মৃতির যোগসূত্রের কথা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
এ কারণে দারোগা বাড়ি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; কুমিল্লার সামগ্রিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও স্থানটির একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি শুক্রবারে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে। মসজিদ ও মাজারকে ঘিরে ধর্মীয় পরিবেশ এবং প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে অনেকেই এখানে আসেন।
ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও প্রাচীন এ মসজিদ ও মাজার প্রাঙ্গণ কুমিল্লার মানুষের কাছে ধর্মীয় অনুভূতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি পরিচিত স্থান হিসেবে টিকে আছে।
কুমিল্লার ইতিহাস ও ইসলামী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে দারোগা বাড়ি মসজিদের যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। প্রাচীন স্থাপনার মূল স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ইতিহাসপ্রেমী ও স্থাপত্য অনুরাগীদের মতে, কুমিল্লার প্রাচীন মসজিদ, মাজার ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে আরও গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি কুমিল্লার নগর ইতিহাসও সংরক্ষিত হবে।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo