মোঃ মাসুদ রানা ;কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
আষাঢ়ের শেষ প্রহরে টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আবারও ফুলেফেঁপে উঠেছে কুমিল্লার প্রাণপ্রবাহ গোমতী নদী। প্রতিদিনই বাড়ছে নদীর পানি। থইথই জলরাশির মাঝে উত্তাল ঢেউ যেন নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে নদী তীরবর্তী জনপদে। মাত্র দুই বছর আগে ২০২৪ সালের বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যে বিভীষিকার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। তাই পানি বাড়ার প্রতিটি খবরই বুড়িচং- ব্রাহ্মণপাড়ার চরাঞ্চলের কৃষক ও সাধারণ মানুষের মনে ফিরিয়ে আনছে সেই ভয়াল স্মৃতি।
সরেজমিনে গোমতী নদীর তীরবর্তী আসাননগর, চরাঞ্চল ও সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নিচু ফসলি জমিতে পানি প্রবেশ শুরু করেছে| অনেক স্থানে নদীর পানি বাঁধের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে| স্রোতের তীব্রতা ও অব্যাহত বৃষ্টিপাতে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে|
বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি সিন্ধুরিয়া পাড়ার এম কবির, তারেক হায়দার, জাবেদ মেম্বার , শামীম হোসেন মেম্বার এবং ব্রাহ্মণপাড়ার আসাননগর এলাকার কৃষক মামুন, সাইফুল ইসলাম, মতি মিয়া বলেন, গত ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের বন্যায় ঘর-বাড়ি, গবাদিপশু আর ফসল—সব হারাইছি| এনজিওর ঋণ আর মানুষের কাছ থেকে ধার করে আবার জমিতে ফসল করেছি| এখন আবার যদি বন্যা হয়, তাহলে আমাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না|
একই এলাকার কৃষক জাকির হোসেন বলেন, কয়দিনের বৃষ্টিতেই গোমতীর পানি ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে| রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না| বারবার বাঁধের দিকে তাকিয়ে থাকি| পানি আর একটু বাড়লেই চরাঞ্চলের ফসল পানির নিচে চলে যাবে|
দীর্ঘদিনের নদীপাড়ের বাসিন্দা মনিরুল আলম বলেন, ২০২৪ সালের বন্যা আমাদের নিঃ¯^ করে দিয়েছে| সেই ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি| পানি বাড়লেই মানুষের বুক কেঁপে ওঠে| বাঁধের দুর্বল অংশগুলো দ্রুত মজবুত করা না হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে|
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগও| ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল মতিন বলেন, নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে| আমরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি| তবে পানি আরও বাড়লে চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে|
এদিকে কুমিল্লা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, গোমতী নদীর উভয় চরে ২১০ হেক্টর জমিতে শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল রোপণ করা হয়েছে| বৃষ্টির পানিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে নদীর পানি ৮.৯৩ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন দিকদিয়ে শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়| অনেক কৃষক মিষ্টি কুমড়া, ডাটা, পানি থেকে উদ্ধার করে| শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় পানি কমে ৮.৩৬ মিটারে এসেছে| আশা করা যায়, আর বৃষ্টি পাত পাহাড়ি ঢলে পানি না আসলে ফসলের কোনো ক্ষতি সাধিত হবে না|
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও শুক্রবার ১০ জুলাই থেকে কিছুটা কমতে শুরু করেছে| তবুও আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি| সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে|
তবে স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতার পরও নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর স্থায়ী সংস্কার হয়নি| তাদের আশঙ্কা, টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে কিংবা উজান থেকে আরও পাহাড়ি ঢল নেমে এলে গোমতীর পানি আবারও বিপৎসীমার দিকে ধাবিত হতে পারে| সে ক্ষেত্রে চরাঞ্চলের শত শত হেক্টর ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও গ্রামীণ সড়ক নতুন করে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে|
নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা—প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি, বাঁধের নিবিড় তদারকি এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেন ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে| কারণ, আরেকটি বড় বন্যা এলে বহু কৃষক ও নিম্নআয়ের পরিবার চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে জীবিকা হারানোর আশঙ্কা করছেন|
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo