বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, সম্পদ অর্জন ও জুয়ার আসর থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ;
স্টাফ রিপোর্টার :
ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালকে ঘিরে বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির, অনিয়ম-দুর্নীতি, জুয়ার আসর থেকে অর্থ আদায় এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাকে নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা জুড়ে চলছে বেশ আলোচনা ও সমালোচনা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সেচ শাখার সেচপাম্প মেরামতকারী শাহ আবুল কাশেমের বড় ছেলে কামাল। এদিকে তাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সংবাদপত্রে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও এমন অভিযোগ তুলে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এর মধ্যে কামাল অন্যতম। আজও খাদ্য পরিদর্শক পদে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে তার খুটির জোর কোথায়? কর্তৃপক্ষের তদন্তের পর প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
গফরগাঁও রাজনৈতিক নেতাদের সুত্রে জানা গেছে,শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি হিসাম ও আরিফের কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া গফরগাঁও সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সাজুর সময়ে নাট্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গফরগাঁওয়ে বিএনপির জনসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কামালও ছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরাসরি আওয়ামীলীগের মিছিল মিটিং এ অংশ গ্রহণ করেন। এ ছাড়াও ২০২০ সালে নেতাদের তদবীর করে উপজেলা এলএসডি হিসেবে বদলী নেয়। এরপর থেকেই সরাসরি আওয়ামীলীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ছবিও তুলেন। পাশাপাশি অফিস ফাকি দিয়ে বিভিন্ন পোগ্রাম গুলোতে নিজে উপস্থিত থেকেছেন।
খোজ নিয়ে জানা গেছে ,গফরগাঁওয়ের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের তদবিরে ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর খাদ্য বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন কামাল। তবে তার নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং ঠিকাদারি সংক্রান্ত বিষয়ে তদবির করে আসছেন শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল। তার কথামতো কাজ না করলে বিভিন্নভাবে হয়রানি বা ক্ষতির মুখে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
২০২০ সালের জুলাইয়ে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডি থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা খাদ্য দপ্তরে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে যোগ দেন বলে জানা যায়।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ময়মনসিংহে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল তার নিজের নামে, বেনামে এবং স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে বিপুল অর্থ-সম্পদ ও বিনিয়োগ করেছেন। ময়মনসিংহ নগরীর মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজায় ৭সি নম্বরের একটি ফ্ল্যাট, আমলাপাড়ায় মাদ্রাসার পাশের একটি ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি দোকান, কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ফাউন্ডেশনের চারতলা ভবন এবং নতুন বাজারের ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গফরগাঁওয়ের জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন বাজারে একাধিক দোকান রয়েছে। ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস এলাকায় এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে কেনা জমিতে তার তিনটি শেয়ার রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত হলেও সেটি শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল ব্যবহার করেন। গাড়িটি মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে রাখা হয় । তবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহার ও অর্থের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বজনদের নামে বিনিয়োগের অভিযোগ
শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের স্ত্রী নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই শাহ ইশতিয়াক রুবেল এবং শ্যালক ফাহিমের নামে বিভিন্ন জায়গায় জমি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা সুলতান অভিযোগ করে বলেন, নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজারে গেন্দু মিয়ার হোটেলের পাশে ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে রাতে জুয়ার আসর বসে। তার দাবি, ওই আসরে একজন ‘বিডার’ হিসেবে অংশ নিয়ে কামাল প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেন। অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ময়মনসিংহের বিএনপি নেতা শামছুল হক বলেন, মাজহারুল ইসলাম কামাল একসময় কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বলে আমরা জানি। চাকরিতে যোগদানের আগে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা কী ছিল এবং বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ কত—এসব বিষয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি কামালের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানান।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিষয়গুলো খোঁজ নিয়ে দেখব।”
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১ অধিশাখা) সনজীদা শরমিন জানান, বিষয়টি নিয়ে একটু ডিজি স্যার এর সাথে কথা বলেন। কোন অভিযোগ আসলে তারাই দেখবে।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুঃ জসীম উদ্দিন খানকে একাধিকবার কল দেওয়া হলে মুঠোফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাসুদুর রহমান
০১৯৭৮৫০৫২৪৪
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo