একজন শিক্ষকেই চলছে পাঠদান, কোথাও পাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষক দিয়ে খোলা হচ্ছে স্কুল
ডেক্স রিপোর্টার;
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার দুর্গম হাওরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট ও পদশূন্যতা চলছে। কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, আবার কোথাও শিক্ষক না থাকায় পাশের বিদ্যালয় থেকে অস্থায়ীভাবে শিক্ষক এনে বিদ্যালয় খোলা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিপরীতে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ও সুবিধাজনক এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে পূর্ণ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বদলির সুযোগ পেলেই অনেক শিক্ষক দুর্গম এলাকার বিদ্যালয় থেকে সুবিধাজনক স্থানে চলে যাওয়ায় শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। এতে দুর্গম হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলি হওয়ার পর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো শিক্ষক নেই। অন্য দুটি বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় খোলা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পুরান খালাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মরত দুজন শিক্ষকই সুবিধাজনক স্থানে বদলির আদেশ পেয়েছেন।
উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের শিবরামপুর, মন্দিয়াতা, জয়পুর, বাঁশতলা ও মনভোজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের উক্তিয়ারগাঁও, কলাপাড়া ও মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উত্তর বড়দল ইউনিয়নের মাহরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজন করে শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় তাহিরপুর উপজেলার জন্য ৪৯ জন শিক্ষক জেলা শিক্ষা অফিসে যোগদান করেছেন। আগামী রোববার (৪ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তাঁদের পদায়নের আদেশ জারি হতে পারে বলে জানা গেছে।
মন্দিয়াতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সানজু মিয়া বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ মোট পাঁচটি পদ রয়েছে। ১২ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। বাড়ি কাছে হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আমি দায়িত্ব পালন করছি। অনেক সময় অন্য কোনো শিক্ষক থাকেন না। ফলে একাই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাঠদান করতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে কাউকে পোস্টিং বা ডেপুটেশনে দেওয়া হলেও তিনিও কোনো না কোনোভাবে বদলি হয়ে যান। বর্তমানে যিনি রয়েছেন, তিনিও বদলির আদেশ পেয়েছেন। নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। আমার বিদ্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।’
শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক হলেন মোয়াজ্জেমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রীতম সরকার ও মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিলন তালুকদার।
প্রীতম সরকার বলেন, ‘শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক না থাকায় উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদের দুজনকে বিদ্যালয়টি খোলা ও শিক্ষার্থীদের হাজিরা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছি। বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়টি সচল রাখতে দ্রুত শিক্ষক প্রয়োজন।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটির সদস্য ও মধ্য তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাখাওয়াত হোসেন পাটোয়ারী বলেন, দুর্গম এলাকা থেকে বদলি হয়ে সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে আসার কারণে দুর্গম এলাকার শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, হাওরাঞ্চলের শিক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুর্গম এলাকায় শিক্ষক পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেক শিক্ষক অধিকতর ভালো যোগাযোগব্যবস্থার বিদ্যালয়ে চলে আসেন। এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে মাত্র একজন শিক্ষক কর্মরত আছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে দুর্গম এলাকার শিক্ষকরা যাতে সেখানে থাকতে পারেন, সে জন্য তাঁদের সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ করে যাতায়াত, আবাসন ও হাওর ভাতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। হাওরপাড়ের মানুষের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের স্বার্থে ছাত্র-শিক্ষক উভয়কে হাওর রেশনিংয়ের আওতায় আনা জরুরি।
আনোয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন, ‘নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক শূন্য ও সংকট রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষক পদায়ন করা হোক।’
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাজন কুমার সাহা বলেন, ‘উপজেলার যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলা শিক্ষা অফিসে চাহিদা পাঠিয়েছি। এখন বিষয়টি জেলা শিক্ষা অফিস বিবেচনা করবে।’
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহনলাল বলেন, ‘সহকারী শিক্ষক পদায়নের বিষয়টি আমাদের কমিটির মাধ্যমে করা হবে। তবে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক শূন্য রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo