কুমিল্লা প্রতিনিধি;
রাজনীতি শুধু রাজপথে সাহস দেখানোর নাম নয়; রাজনীতি হলো শিষ্টাচার, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার এক কঠিন পরীক্ষা। কে কতবার হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, কে পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন—এসব অবশ্যই রাজনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু নিজের সেই সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে দলের প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতাদের অসম্মান করার অধিকার কারও জন্মায় না।
সম্প্রতি আউয়াল খানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেবীদ্বারের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্বস্তি, ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগের বিষয়। এর আগেও তাঁর নামে প্রচারিত একটি অডিও বক্তব্যে সাবেক চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিবিদ জনাব ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জনাব তারেক মুন্সীকে নিয়ে আপত্তিকর ও অসম্মানজনক মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত সেখান থেকেই বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই দুই জ্যেষ্ঠ নেতা তাঁকে আঘাত করা তো দূরের কথা, প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বয়সের ব্যবধান এবং সাংগঠনিক দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। একজন অপেক্ষাকৃত নবীন নেতার বক্তব্যের জবাব দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল না করাই হয়তো তাঁরা সমীচীন মনে করেছেন।
কিন্তু তাঁদের এই নীরবতাকে কেউ যেন দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা না করেন।
নীরবতা সব সময় অসহায়ত্বের ভাষা নয়; কখনো কখনো নীরবতাই একজন প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ নেতার সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর।
জনাব ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী কোনো হঠাৎ আবির্ভূত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তিনি চারবার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যদিকে জনাব তারেক মুন্সী কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দেবীদ্বারসহ কুমিল্লা উত্তর জেলায় তাঁদের অসংখ্য নেতা-কর্মী, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন।
এমন দুই নেতাকে উদ্দেশ করে অবমাননাকর কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া মানে শুধু দুজন ব্যক্তিকে আহত করা নয়; তাঁদের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা পোষণকারী বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর অনুভূতিকেও আঘাত করা। ফলে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে, উত্তেজনা বাড়বে এবং এলাকার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বিঘ্নিত হবে—এটাই স্বাভাবিক।
নিজেকে “ঢাকার নেতা” হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিংবা নিজের হামলা-মামলা ও সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা দোষের কিছু নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে—ঢাকার রাজপথে সাহস প্রদর্শন যেমন সম্মানের, তেমনি নিজ এলাকার প্রবীণ নেতাদের সম্মান করাও রাজনৈতিক শিক্ষার অপরিহার্য অংশ। রাজপথের সাহস যদি আচরণের বিনয়ে প্রতিফলিত না হয়, তবে সেই সাহস মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে না।
আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেউই দলের চেয়ে বড় নই, সংগঠনের শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে নই এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে নই।
নিজেকে বড় প্রমাণ করতে অন্যকে ছোট করতে হয় না। কারণ অন্যকে অসম্মান করে কেউ বড় নেতা হন না; বরং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সংকীর্ণতাই প্রকাশিত হয়।
রাজনীতিতে বয়সের ব্যবধান শুধু সংখ্যার পার্থক্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস। যাঁরা বয়স, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থানে জ্যেষ্ঠ—তাঁদের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, সমালোচনাও হতে পারে; কিন্তু ভাষা কখনো শালীনতার সীমা অতিক্রম করতে পারে না। মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, আর অসম্মান সাংগঠনিক অবক্ষয়ের সূচনা।
তাই আউয়াল খানের প্রতি আহ্বান—তাঁর নামে প্রচারিত অডিও কিংবা সাম্প্রতিক বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকলে তিনি যেন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। আর আবেগের বশবর্তী হয়ে অনভিপ্রেত কোনো মন্তব্য করে থাকলে তা প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক উদারতা ও সাহসের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন। ভুল স্বীকার করলে মানুষ ছোট হয় না; বরং নিজের ভুল সংশোধন করার মধ্যেই একজন নেতার পরিপক্বতা ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নেতা-কর্মীর প্রতি অনুরোধ—কেউ আবেগতাড়িত হয়ে এমন কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে। ব্যক্তির একটি অসংযত মন্তব্য যেন দেবীদ্বারের বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য, শান্তি ও সহমর্মিতাকে ধ্বংস করতে না পারে।
আজ আমাদের প্রয়োজন বিভেদ নয়—ঐক্য; প্রতিহিংসা নয়—সহনশীলতা; আত্মপ্রচার নয়—জনগণের সেবা; এবং জ্যেষ্ঠদের অবজ্ঞা নয়—তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ।
রাজনীতি অহংকারের সিংহাসন নয়—এটি বিনয়, ত্যাগ ও মানুষের ভালোবাসায় নির্মিত একটি দায়িত্বের মঞ্চ। এখানে উচ্চকণ্ঠ হলেই বড় নেতা হওয়া যায় না; বড় নেতা হতে হলে বড় হৃদয়, সংযত ভাষা এবং অন্যকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হয়।
আসুন, আমরা ব্যক্তিগত অহংকার ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে দলের বৃহত্তর স্বার্থ, দেবীদ্বারের শান্তি এবং নেতা-কর্মীদের ঐক্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। কারণ ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দল, আদর্শ ও জনগণের স্বার্থ চিরস্থায়ী।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo