মোঃ মাসুদ রানা কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি ;
প্রাচীন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কুমিল্লা। জেলার লালমাই-ময়নামতি পাহাড় থেকে শুরু করে শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর, ধর্মসাগর, গোমতী নদীর পাড়সহ রয়েছে দর্শনীয় অসংখ্য স্থান। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও কুমিল্লায় এখনো গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত ও আধুনিক কোনো পর্যটনকেন্দ্র। বিভিন্ন সময়ে লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়কে ঘিরে পর্যটন নগর গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’।
দিবসটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভ্রমণ পরিকল্পনা, হোটেল বুকিং ও পর্যটন গন্তব্য নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যটন খাতকে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এবার প্রথমবারের মতো ১৩টি ক্যাটাগরিতে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ দেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে লালমাই পাহাড়ের ৫০ একর জায়গাজুড়ে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১০ সালে কুমিল্লায় পর্যটন মোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থসংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, লালমাই পাহাড়ের চণ্ডীমূড়া থেকে কোটবাড়ীর শালবন বিহার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে বিপুল প্রত্নসম্পদ। কোটবাড়ী এলাকায় শালবন বিহার, রূপবান মূড়া, কোটালি মূড়া, আনন্দবিহার, রানির বাংলোসহ রয়েছে প্রায় ২৩টি পুরাকীর্তি।
এ ছাড়া একই এলাকায় রয়েছে ময়নামতি জাদুঘর, বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (বার্ড), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বনকুটির ও লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। লালমাই পাহাড় ও কোটবাড়ীতে রয়েছে দুটি পার্ক। পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তে চণ্ডীমূড়া মন্দির এবং টাল্লো টিলা থেকে উপভোগ করা যায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সদর দক্ষিণ উপজেলার রাজেশপুরে রয়েছে ইকোপার্ক। বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালিতে ঘেরা এই পার্কও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
শুধু কোটবাড়ী কিংবা লালমাই নয়, কুমিল্লা নগরীর মধ্যেও পর্যটন বিকাশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। ধর্মসাগর, রানির দিঘি, নানুয়ার দিঘি, আমির দিঘি, লাউয়া দিঘি এবং গোমতী নদীর পাড় ঘিরে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া কুমিল্লায় রয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিচিহ্ন, সুরসম্রাট শচীন দেববর্মনের বাড়ি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান।
বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্র বাড়লেও নিরাপত্তা প্রশ্নে
কোটবাড়ী এলাকায় বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানায় ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক, ডাইনো পার্ক, ব্লু ওয়াটার পার্ক, লালমাই লেক ল্যান্ডসহ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। গোমতী নদীর পাড়েও গড়ে উঠেছে কয়েকটি বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্র।
তবে এসব বিনোদনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন বলেন, কুমিল্লায় বেড়াতে এলে একই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। ঢাকার কাছের জেলা হওয়ায় এখানে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারে।
তিনি বলেন, বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের জন্যও কুমিল্লায় দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই কুমিল্লা একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এই ঐতিহাসিক জনপদকে ঘিরে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, কুমিল্লা নগরকে সুন্দর ও আধুনিক করতে নানা ধরনের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ধর্মসাগর পাড়কে আরও আকর্ষণীয় করার জন্য সিটি করপোরেশন কাজ করছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশেও তারা কাজ করবেন।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে কুমিল্লার পর্যটন সম্ভাবনা আবারও সামনে এসেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নসম্পদ ও প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয় থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামোর অভাব রয়েছে জেলায়।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, সড়ক যোগাযোগ, নিরাপত্তা, পর্যটন অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo