মানুষের অধিকার রক্ষার চেয়ে পরিচয়পত্র বিতরণই কি কিছু সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য?
বিশেষ প্রতিনিধি ;
মানবাধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার। সমাজে অন্যায়, নির্যাতন, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কিছু সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ, পরিচয়পত্র বিতরণ এবং কার্ডের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের কার্যক্রম নিয়ে উঠছে আলোচনা।
প্রশ্ন হচ্ছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাজ কি শুধুই কার্ড বিতরণ আর সদস্য সংগ্রহ? নাকি মানুষের অধিকার রক্ষায় বাস্তব কোনো ভূমিকা রাখার দায়বদ্ধতাও রয়েছে?
কার্ড আছে, মানবিক কার্যক্রম কোথায়?
একটি মানবাধিকার সংগঠনের পরিচয়পত্র থাকা অপরাধ নয়। সংগঠন পরিচালনার প্রয়োজনে সদস্যপদ, পরিচয়পত্র ও নির্ধারিত ফি থাকতে পারে। কিন্তু পরিচয়পত্র বিতরণই যদি সাংগঠনিক কার্যক্রমের প্রধান দৃশ্যমান দিক হয়ে ওঠে, আর নির্যাতিত মানুষ সহায়তা না পান, তাহলে সেই সংগঠনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মানবাধিকারকর্মী পরিচয়ের আড়ালে কেউ যেন ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ কিংবা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ না পান, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ায় কতটি সংগঠন?
কোনো মানুষ অন্যায়ভাবে নির্যাতনের শিকার হলে, কোনো নারী সহিংসতার শিকার হলে কিংবা কোনো অসহায় পরিবার ন্যায়বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভূমিকা কী? তারা কি আইনি সহায়তা দেয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ উত্থাপন করে, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয় কিংবা ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন। কারণ, একটি সংগঠনের প্রকৃত মূল্যায়ন তার ব্যানার, পদবি কিংবা পরিচয়পত্রের সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং মানুষের অধিকার রক্ষায় তার কার্যকর ভূমিকা দিয়ে হওয়া উচিত।
অর্থ সংগ্রহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জরুরি
সংগঠন পরিচালনার জন্য সদস্য ফি বা অনুদান গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে অর্থ সংগ্রহের নিয়ম, রসিদ প্রদান, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং অর্থের ব্যবহার স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। সদস্যদেরও জানার অধিকার রয়েছে, তাদের দেওয়া অর্থ কোন কাজে ব্যয় হচ্ছে এবং সংগঠনটি কী ধরনের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে কার্ড বিক্রির নামে অনিয়ম বা প্রতারণার অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা উচিত। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বৈধভাবে কাজ করা সংগঠনগুলোর মানবিক উদ্যোগকেও স্বীকৃতি দিতে হবে।
নিবন্ধন ও কার্যক্রম যাচাই করা প্রয়োজন
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নিবন্ধন, গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে থেকে অভিযোগ পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব হলো, যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরা। কোনো সংগঠনকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত না করে নির্দিষ্ট অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয়।
মানবাধিকার কোনো পরিচয়পত্রের ব্যবসা নয়
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সাহস, সততা, মানবিকতা ও জবাবদিহি। শুধু পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে মানবাধিকারকর্মীর পরিচয় দেওয়া যায়, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে কাজের মাধ্যমে তার প্রমাণ দিতে হয়।
এখন সময় প্রশ্ন তোলার—মানবাধিকার সংগঠনগুলো মানুষের অধিকার রক্ষায় কী করছে? কতজন অসহায় মানুষ সহায়তা পাচ্ছেন? সংগৃহীত অর্থের হিসাব কতটা স্বচ্ছ? আর পরিচয়পত্র বিতরণের বাইরে তাদের বাস্তব অবদান কী?
মানবাধিকারের নামে যদি কোনো অনিয়ম ঘটে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। আর যারা সত্যিকার অর্থে মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোও সমাজের দায়িত্ব।
মানবাধিকার সংগঠনের সাফল্য কার্ডের সংখ্যায় নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদানে।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo