মোঃ মাসুদ রানা;
জীবনটা ছিল তাঁর এক দীর্ঘ সংগ্রামের। কখনো পরিবারের আবেগ-অনুভূতি, কখনো রাজনীতির কঠিন ময়দান, কখনো কারাবরণ, আবার কখনো প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে অটল থাকার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন; তিনি দেশের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথটি ছিল মোটেও সহজ নয়। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন তিনি।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরও তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদীয় রাজনীতি, সরকার পরিচালনা এবং বিরোধী দলের নেতৃত্ব—তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ১৯৮০-এর দশকে রাজপথের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে আছে। আন্দোলন, নির্বাচন, সংসদ এবং সরকার পরিচালনা—রাজনীতির নানা পর্যায়ে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন তিনি।
তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু সাফল্যের নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, রাজনৈতিক সংঘাত ও সমালোচনাও। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর নেতৃত্ব ও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর মূল্যায়নও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ে থাকে।
ব্যক্তিগত জীবনেও একের পর এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবনে নেমে আসে এক কঠিন অধ্যায়। এরপর রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, গৃহবন্দিত্ব ও কারাবাসের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে তাঁকে।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, কারাবাস এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে জীবনের শেষ পর্বটিও ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা।
ব্যক্তিগত জীবনের শোকও তাঁকে কম সহ্য করতে হয়নি। বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু ২০১৫ সালে তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। একদিকে পারিবারিক শোক, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ—দুইয়ের ভারই তাঁকে বহন করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়।
খালেদা জিয়ার জন্মতারিখ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও তথ্যগত বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন নথি ও প্রকাশিত তথ্যে জন্মতারিখ নিয়ে ভিন্নতা দেখা যায়। তবে এসব বিতর্কের বাইরে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবই ইতিহাসের বিচারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেবিদ্বারের রাজনীতিতেও খালেদা জিয়ার প্রভাব
বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক পথচলাও গভীরভাবে যুক্ত। কুমিল্লার দেবিদ্বারেও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্যের কথা বিভিন্ন কর্মসূচিতে উঠে আসে।
সম্প্রতি কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের বিএনপি মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী, সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও বেলজিয়াম বিএনপির সভাপতি সাইদুর রহমান লিটল, ব্যারিস্টার রিজভী হাসান মুন্সিস
দেবিদ্বারের তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত সাংবাদিক মোঃ মাসুদ রানাও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১০ নম্বর দক্ষিণ গুনাইঘর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি, দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনীতির মাঠে পদ-পদবি, আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা নির্বাচন—সবকিছুর মধ্যেই একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকেরা। আর সেই তৃণমূলের রাজনীতির মধ্য দিয়েই একজন নেতার আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অধ্যায়
রাজনীতি কখনো শুধু ক্ষমতার গল্প নয়; এটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আন্দোলন, মতাদর্শ, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং ত্যাগেরও গল্প। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি দীর্ঘ প্রতিচ্ছবি।
প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে উঠে আসা, রাজনীতির কঠিন পথ পেরিয়ে নেতৃত্বের শীর্ষে পৌঁছানো এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী হওয়া—বেগম খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে ফিরে দেখা।
তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি সংগ্রাম, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শুভ জন্মদিন, প্রিয় নেত্রী।
আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অবদানকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। 🌹🇧🇩
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo