মোঃ জহিরুল ইসলাম ;
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের কথা বলা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে দেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা পেশা নানা সংকট, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
একসময় সাংবাদিকতা ছিল আদর্শ, দায়িত্ববোধ ও সাহসের পেশা। সংবাদ সংগ্রহের জন্য মাঠে ছুটে বেড়ানো, তথ্য যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং সত্যকে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই ছিল সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যে সংবাদ প্রকাশ করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুততার প্রতিযোগিতায় সংবাদ যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে যে কেউ সংবাদ প্রকাশ করতে পারছেন। এতে তথ্যপ্রবাহ সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, ভিত্তিহীন তথ্য, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম এবং যাচাইহীন সংবাদও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো সাংবাদিকতা পেশার ওপর।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহার। প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময় শোনা যায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে পেশাদার ও সৎ সাংবাদিকদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় এবং সাংবাদিকতার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে, যারা সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতা করছেন, তাদের একটি বড় অংশই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করছেন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের অনেকেই পর্যাপ্ত সম্মানী, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। ফলে সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সংবাদপত্রের মালিক ও সম্পাদকদেরও বাস্তব সংকট রয়েছে। কাগজ, মুদ্রণ, পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপনের সীমিত সুযোগ এবং অনলাইন মাধ্যমে পাঠকের দ্রুত স্থানান্তর—সব মিলিয়ে প্রিন্ট সংবাদপত্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার সংগ্রামে রয়েছে।
তবে সংকট যতই থাকুক, সাংবাদিকতার মূলনীতি থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। অর্থ, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে সত্যকে বিসর্জন দিলে সাংবাদিকতার মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
তাই এখন প্রয়োজন সাংবাদিকতা পেশায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে তা সংশোধন এবং সাংবাদিকতার নৈতিক নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, ন্যায্য সম্মানী ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সাংবাদিকতা যেন কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম না হয়ে ওঠে—এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন এবং সাংবাদিকদের নিজেদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
আজকের এই সংকট হয়তো কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। সৎ সাংবাদিকতা, দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম এবং পেশাগত জবাবদিহির সমন্বয় ঘটাতে পারলে সাংবাদিকতা আবারও মানুষের আস্থা ও মর্যাদার জায়গায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
সত্য প্রকাশের সাহস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই হোক সাংবাদিকতার মূল শক্তি।
web;https://www.dainikbanglaralo.com, ✉️ banglaralodainik@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, Dainik Banglaralo