
মোঃ জহিরুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক বাংলার আলো
মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আযহা। ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য শিক্ষায় সমৃদ্ধ এই উৎসব মুসলমানদের জীবনে গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রতি বছর জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা ঈদুল আযহা উদযাপন করেন। এই ঈদের মূল প্রতিপাদ্য হলো কুরবানী—যার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
ঈদুল আযহার ইতিহাস জড়িয়ে আছে মহান আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর অসীম ত্যাগ ও আনুগত্যের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। মহান আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় পুত্রকে কুরবানী করার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হযরত ইবরাহিম (আ.) মানবজাতির জন্য ত্যাগের এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আল্লাহ তাঁর আন্তরিকতা কবুল করে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কুরবানীর ব্যবস্থা করেন। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলিম সমাজে কুরবানীর বিধান চালু হয়েছে।
কুরবানী কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না পশুর গোশত কিংবা রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” অর্থাৎ কুরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো হৃদয়ের পবিত্রতা ও আল্লাহভীতি অর্জন করা।
বর্তমান সমাজে ঈদুল আযহার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষ ভোগবাদ, প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপরতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সামাজিক বৈষম্য, হিংসা-বিদ্বেষ ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের সমাজকে ক্রমেই অস্থির করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় কুরবানীর শিক্ষা মানুষকে সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
ঈদুল আযহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। কুরবানীর গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব মানুষের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হয়। ইসলামের এই সামাজিক শিক্ষাই একটি সাম্য ও মানবিক সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তবে দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে ঈদের প্রকৃত চেতনার চেয়ে বাহ্যিক আড়ম্বর বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শন, অপচয় এবং অসুস্থ সংস্কৃতি ঈদের মূল শিক্ষাকে অনেক সময় আড়াল করে দেয়। অথচ কুরবানীর প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে বিনয়, সংযম ও আন্তরিকতায়।
একই সঙ্গে কুরবানীর সময় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি। নির্ধারিত স্থানে পশু কুরবানী, বর্জ্য দ্রুত অপসারণ এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, ঈদুল আযহা আমাদের শুধু উৎসবের আনন্দই দেয় না; এটি ত্যাগ, মানবতা ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যদি আমরা কুরবানীর এই মহান আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে একটি মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। পবিত্র ঈদুল আযহার মূল বার্তা হোক—ত্যাগে মহিমা, মানবতায় সৌন্দর্য।