
মো: মকসেদ আলী
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ হলো ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় বস্তু ও পশু উৎসর্গ করার মাধ্যমে বান্দার নিখাদ আনুগত্য ও তাকওয়া বা খোদাভীতি প্রকাশ পায়।
ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শারঈ তরীকায় যে পশু যবহ করা হয়, তাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়। সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কুরবানী’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে। যদিও কুরবানী সারাদিন ও পরের দুদিন করা যায়। আর কোরবানির শাব্দিক অর্থ ত্যাগ। জিলহজ্ব মাসের দশ তারিখে পরম ত্যাগের নির্দেশনা স্বরূপ বিশ্ব মুসলিম মহাসমারোহে হজের অন্যতম অংশ পশু জবাইয়ের মাধ্যমে কোরবানি/ঈদুল আযহা উৎসব পালন করে। সুতরাং ত্যাগের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মুসলমান জাতি যে উৎসবে মিলিত হয় তাই ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ।
কোরবানি মুসলিম জাতির একটি ঐতিহ্য হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণেই রাসুল (সা) সব সময় কোরবানি করেছেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি তিনি সতর্কবানী উচ্চারণ করেন। রাসুল (সা) বলেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।
কুরবানীর ইতিহাস ততোটাই প্রাচীন যতোটা প্রাচীন মানব অথবা ধর্মের ইতিহাস। আল্লাহ রাহে কুরবানী মানব জাতির প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত সকল শরীয়তেই কার্যকর ছিলো। সকল নবীর উম্মতকেই কুরবানী করতে হয়েছে। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তায়ালার এ বিধান মানব জাতির সৃষ্টি লগ্ন থেকেই কার্যকর হয়ে আসছে। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে, পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোন না কোন ভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে ।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশে তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর এই অসীম আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে পুত্রের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি কবুল করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে প্রতি বছর ১০ জিলহজ মুসলিম উম্মাহ পশু কোরবানি করে থাকে। ‘কোরবানি’ শব্দের আভিধানিক অর্থই হলো নৈকট্য বা সান্নিধ্য লাভ। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে মূলত মুমিনের অন্তরের অহংকার, লোভ ও রিপু বিসর্জন পায় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়।
আল্লাহর যে কোনো আদেশ হাসিমুখে মেনে নেওয়ার শিক্ষা দেয় এই উৎসব। নিজের সব মোহ, ভোগ-বিলাস ও ভালোবাসার ঊর্ধ্বে স্রষ্টার নির্দেশকে প্রাধান্য দেওয়া মুমিনের প্রধান কর্তব্য। কোরবানির গোশত গরিব, আত্মীয়-স্বজন ও নিজেদের মাঝে বণ্টন করার নিয়ম রয়েছে। এটি সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও দানশীলতার মনোভাব গড়ে তোলে।
পশুর রক্ত ও মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের মনের তাকওয়া। তাই কোরবানির মূল শিক্ষা হলো নিজের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ ও অমানবিক মানসিকতা চিরতরে বিসর্জন দিয়ে একটি সুন্দর ও পবিত্র জীবন গঠন করা। ঈদুল আজহা ত্যাগের আনন্দের পাশাপাশি মানবতার সেবার এক অনন্য বার্তা বহন করে।
মো: মকসেদ আলী
কবি ও সাহিত্যিক
বুড়াবুড়ি
তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়