বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন
মোঃ আঃ কুদ্দুস খান;
বিশেষ প্রতিনিধি, পিরোজপুর;
ইতিহাস, প্রমাণিত ঐতিহ্য, অহংকার, দাম্ভিকতা ও বীরদর্প—কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। কালের গর্ভে সবই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু থেকে যায় অত্যাচার, নিপীড়ন ও শোষণের স্মৃতিগুলো—যা যুগের পর যুগ স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে বংশ পরস্পরায় মানুষকে সতর্ক করে দেয়।
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে যে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার মূল নায়ক ছিল মীরজাফর ও ঘষেটি বেগম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—নবাব সিরাজউদ্দৌলা কিংবা মোহন লালের মতো দেশপ্রেমিকের জন্ম বিরল হলেও, মীরজাফরদের জন্ম হয় ঘরে ঘরে। এই বিশ্বাসঘাতকতার বীজ থেকেই বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে জমিদারি শাসনের সূচনা ঘটে। ব্রিটিশ জমিদার এডওয়ার্ড পেরীক্যাসপার্স সাহেব দায়িত্ব নেন এই অঞ্চলের জমিদারিত্বের। তিনি তাঁর আস্তানা গড়ে তোলেন পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের কুটির বাড়ীতে। এডওয়ার্ড পেরীক্যাসপার্সের পিতার নাম ছিল শিলার সাহেব। তাঁর নামানুসারেই এলাকার নামকরণ হয় শিলারগঞ্জ। পরবর্তীতে আংশিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নাম হয় সাপলেজা, যদিও কাগজপত্রে শিলারগঞ্জ নামটি আজও রয়ে গেছে।
১৪ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই কুটির বাড়ীতে ছিল তিনটি পুকুর ও তিনটি ভবন নিয়ে বিশাল জমিদার বাড়ি। বছরে এক বা দুইবার জমিদার এখানে এসে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে ফিরে যেতেন। কিন্তু এই স্থাপনাটির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ইট বহন করে রেখেছে নির্মম নির্যাতনের স্মৃতি।
একটি ভবনে থাকত খাজনা আদায়ের তোষামোদকারী চাপরাশি, বড় ভবনে থাকত জমিদার নিজে, আর পশ্চিম পাশের ছোট ভবনে থাকত লাল পাগড়ি পরা বল্লমধারী আর্দালী ও পেয়াদারা। কোনো কৃষক খাজনা দিতে না পারলে তাকে ধরে এনে অন্ধকার কক্ষে আটকে রাখা হতো। পরদিন রশি দিয়ে ঝুলিয়ে চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন।
প্রায় তিনশত বছরের পুরোনো চুন-শুটকি দিয়ে গাঁথা জীর্ণ ভবনগুলো যেন আজও সেই আর্তনাদের প্রতিধ্বনি বহন করে চলেছে। আর যারা চাটুকারিতা ও তোষামোদ করত, তারাই পেত জমির মালিকানা।
আজ সেই জমিদার নেই। নেই তার শাসনক্ষমতা। কিন্তু তার শোষণ ও অত্যাচারের চিহ্ন রয়ে গেছে প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি ইটে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতির ধারক বাহক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলেও এই স্থাপত্যকীর্তির সংরক্ষণে নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ।
সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান হাবিব উদ্যোগ নিলেও ভান্ডারিয়ার একটি কুচক্রী মহল প্রকল্পটি কেটে ভান্ডারিয়ায় নিয়ে যায়—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
অতএব বলা যায়, অত্যাচারীরা বেঁচে থাকে না। কিন্তু পলাশীর আম্রকানন কিংবা এডওয়ার্ডের কুটির বাড়ীর মতো স্থান যুগের পর যুগ মানুষের মনে জাগিয়ে রাখবে তাদের চরিত্র, তাদের নির্যাতনের ইতিহাস ও নির্মম রূপকথা।