
মোঃ মাসুদ রানা, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি:
‘আম্মু শেখ হাসিনা পালাইছে। আমরা মিছিল নিয়ে শাহবাগ যাচ্ছি।’ মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে এটাই ছিল জুলাই শহীদ হামিদুর রহমান সাদমানের শেষ কথা। ছেলের সেই মধুর কণ্ঠ এখনো কানে বাজে বলে জানালেন শহীদের মা কাজী শারমীন আক্তার।
তিনি বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্যও ছেলের স্মৃতি মন থেকে আড়াল হয় না। ছেলের শহীদি মৃত্যু নিয়ে আমি গর্বিত। এদেশে আর কোনো স্বৈরাচারকে দেখতে চাই না। ছেলের বিচার দেখে যেতে চাই।’
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকার বংশালে শহীদ হয়েছিলেন কুমিল্লার হামিদুর রহমান সাদমান (২০)। জুলাই এলেই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ডাক পড়ে শারমীনের। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই শহীদ-মাতা ছেলের কথা মনে হলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সাদমান কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার চৌয়ারা ইউনিয়নের দিঘলগাঁও মজুমদার বাড়ির বাহরাইন প্রবাসী ইকবাল হোসেন মজুমদারের ছেলে। মায়ের সঙ্গে সে কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জের গোয়াল পট্টি এলাকায় থাকত। সিসিএন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে ২০২৪ সালের জুনে সাদমান ঢাকায় ইন্টার্ন করতে যায়।
স্বজনদের কাছ থেকে জানা গেল, জুলাই অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল সাদমান। ছাত্রজনতার আন্দোলনে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজপথে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে ছাত্রজনতার সঙ্গে কেরানীগঞ্জ থেকে বিজয় মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে রওয়ানা হয় সে। মিছিলটি বংশাল থানার সামনে এলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছোড়ে মিছিলে। এতে সাদমানের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
এ সময় বন্ধু রাফি ও আল আমিন তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যায়। বিকাল ৫টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই রাতেই বন্ধুরা অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লা নগরীর বাসায় তার লাশ নিয়ে আসে। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের তালিকার ৬২৩ নম্বরে সাদমানের নাম রয়েছে।
শহীদ সাদমানের মা শারমীন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার জন্য আমার ছেলে রক্ত দিয়েছে। আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। এজন্য আমি গর্বিত। মনকে সান্ত্বনা দিই। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’
তিনি বলেন, ‘নতুন কোনো ফ্যাসিস্টের জন্ম হলে আমার মতো মায়েরা তাদের সন্তানকে আন্দোলনে পাঠিয়ে সরকারের পতন ঘটাবে।’ এ সময় তিনি ছেলে হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, শেখ হাসিনাসহ জড়িত সবার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
শহীদ সাদমানের ছোটভাই আশরাফুল আমিন সাফি জানায়, ‘মায়ের কাছে ভাইয়ার ছবিই এখন একমাত্র সম্বল। ভাইয়ের পুরোনো ছবি সব সময় সামনে রাখেন মা। ভাইকে হারিয়ে আমাদের পুরো পরিবারটাই নিথর হয়ে গেছে।’
প্রশাসন থেকে জুলাই শহীদদের পরিবারে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে বলে জানালেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার।