
দেবীদ্বার প্রতিনিধি;
কুমিল্লার দেবীদ্বারে একটি স্পর্শকাতর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানববন্ধন ও প্রতিবাদের নামে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে অপপ্রচার, সামাজিক বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে মানববন্ধন, প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশ নাগরিকের অধিকার। তবে সেই অধিকারকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, গোষ্ঠীগত স্বার্থ কিংবা কোনো ব্যক্তি বা পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্ট দেবীদ্বারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে রাজনৈতিক মিছিল করানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের সিঙ্গারা ও সমুচা খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে মিছিলে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পাশাপাশি কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জনাব হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং ছোট শালঘরের কৃতি সন্তান, বেলজিয়াম বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য জনাব সাইদুর রহমান লিটনও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, যখন বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তের আওতায় এসেছে এবং দায়িত্বশীল মহলও আইনগত পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তখন তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা সম্মানিত ব্যক্তিদের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়িয়ে প্রচার চালানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তারা বলেন, কোনো মিথ্যা বা অপ্রমাণিত অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ন করে না; বরং তার পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং পুরো এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয়, সামাজিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয়কে সামনে এনে মানুষের আবেগ উসকে দেওয়া হলে তা দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করার অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হোক। সত্যিই যদি সিঙ্গারা ও সমুচা খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের রাজনৈতিক মিছিলে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তাদের মতে, শিশুদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, কারা তাদের মিছিলে নিয়ে গেছে, কীভাবে তাদের সেখানে নেওয়া হয়েছিল এবং এর পেছনে কারা ছিলেন—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
এলাকার প্রবীণ ও সচেতন নাগরিকদের অনেকে মনে করেন, গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষ ও তরুণদের ব্যক্তিগত বিরোধ বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। এতে তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত হয়, পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে এবং একটি ছোট বিরোধও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
তাদের ভাষায়, একটি গ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে সেই বন্ধন নষ্ট হলে ক্ষতি হয় গোটা সমাজের।
এ প্রেক্ষাপটে দেবীদ্বার উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি স্থানীয় সচেতন মহলের আহ্বান—৫ আগস্টের মূল ঘটনার পাশাপাশি ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানববন্ধন বা অন্য কোনো কর্মসূচির আড়ালে কারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে, সম্মানিত বা নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করছে কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টের চেষ্টা করছে—সেসব অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হোক।
তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে, মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, কারও সম্মানহানি করেছে কিংবা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, তাহলে তাদের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
সচেতন মহল আরও বলেছে, এটি কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে রক্ষার দাবি নয়; বরং সমাজকে বিভাজন, অপপ্রচার ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে রক্ষার দাবি।
তাদের প্রত্যাশা—দেবীদ্বারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু প্রতিবাদের নামে নিরপরাধ মানুষের সম্মানহানি হবে না; রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্ক নষ্ট হবে না; ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট থাকবে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, মানববন্ধন হোক ন্যায়বিচারের জন্য, প্রতিহিংসার জন্য নয়; প্রতিবাদ হোক সত্যের পক্ষে, অপপ্রচারের জন্য নয়; আর রাজনীতি হোক মানুষের কল্যাণে, সমাজকে বিভক্ত করার জন্য নয়।
তাদের দাবি, ৫ আগস্টের ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তই হোক একমাত্র ভিত্তি। তদন্তে যার দায় প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তদন্তের আগে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।