রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ :
দেবীদ্বারের সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডে লাইলির ভূমিকা কী ছিল, আজকের হত্যার নেপথ্যে কী?; দৌলতপুর ইউনিয়নের গণমানুষের আশা-ভরসার প্রতীক: রাজিব হোসেন; দেবিদ্বারে ভাড়াটিয়ার হাতে বাড়ির মালিক খুন, পলিথিনে মোড়ানো লাশের ৯ প্যাকেট উদ্ধার, আটক ১; নওগাঁর আত্রাইয়ে পুলিশের অভিযানে ৫ জন গ্রেপ্তার; কবিতা: চমকের পাঠ কৌশল ; আমান উল্লাহ আমানের সাথে নিশু ও মহিলা দলের নেত্রীদের সৌজন্য স্বাক্ষাৎ ; মানববন্ধনের নামে অপপ্রচার নয়, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি; জননেতা শাহরিয়ার ইমন: জালালপুর ইউনিয়নের মাটি ও মানুষের আস্থার প্রতীক; কবিতা: লেখক ছড়া ; বাগেরহাটে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে মামলা, ৫ জন আসামি;

দেবীদ্বারের সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডে লাইলির ভূমিকা কী ছিল, আজকের হত্যার নেপথ্যে কী?;

  • Update Time : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার পঠিত

ছয় বছর পর জামিনে আসামিরা, পুরোনো হত্যার ছায়ায় নতুন করে প্রশ্ন

মোঃ মাসুদ রানা
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি

কুমিল্লার দেবীদ্বারে ২০২১ সালে পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ওই ঘটনায় শিশুটির বাবা আমির হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। তৎকালীন র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী লাইলি আক্তারের সঙ্গে আমির হোসেনের কথিত বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়টি শিশু ফাহিমা জেনে ফেলায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই মামলায় লাইলি আক্তারকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রায় ছয় বছর পর দেবীদ্বারে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবারও ‘লাইলি আক্তার’ নামটি আলোচনায় এসেছে। তবে ২০২১ সালের মামলার লাইলি আক্তার এবং বর্তমান ঘটনায় আটক লাইলি আক্তার একই ব্যক্তি কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।

যেভাবে আলোচনায় এসেছিল ফাহিমা হত্যাকাণ্ড

২০২১ সালের ৭ নভেম্বর বিকেলে দেবীদ্বারে পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার নিখোঁজ হয়। পরে তার বাবা আমির হোসেন থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। শিশুটিকে খুঁজে এলাকায় মাইকিংও করা হয়।

এর সাত দিন পর ১৪ নভেম্বর দেবীদ্বারের কাচিসাইর গ্রামের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তৎকালীন র‌্যাবের তদন্তে বলা হয়েছিল, আমির হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেশী লাইলি আক্তারের প্রায় এক বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে শিশু ফাহিমা তাদের কথিত অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে এবং বিষয়টি তার মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল বলে র‌্যাব দাবি করে। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ফাহিমাকে চকলেট কিনে দেওয়ার ও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ বস্তায় ভরে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।

হত্যাকাণ্ডের পর শিশুটির বাবা নিজেই মেয়ের নিখোঁজের প্রচার চালান এবং থানায় মামলা করেন—এমন তথ্যও দিয়েছিল র‌্যাব। পরে গরুর খাবারের বস্তার সূত্র ধরে তদন্তে অগ্রগতি আসে। একপর্যায়ে আমির হোসেন, লাইলি আক্তারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ফাহিমা হত্যায় লাইলির ভূমিকা নিয়ে কী বলেছিল র‌্যাব?

তৎকালীন র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছিল, লাইলি আক্তার হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। র‌্যাবের ভাষ্য ছিল, আমির হোসেন লাইলিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন এবং তাদের সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে এসব ছিল র‌্যাবের তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া বক্তব্য। কোনো আসামির অপরাধমূলক দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার এখতিয়ার আদালতের।

ছয় বছর পর আবারও আলোচনায় ‘লাইলি’

পুরোনো ওই মামলার আসামিরা কয়েক বছর পর জামিনে বেরিয়ে আসেন বলে জানা গেছে। মামলার এক আসামি রেজাউল ইসলাম ইমন পরে প্রবাসে চলে যান বলেও জানা গেছে। অন্যরা দেশে অবস্থান করছিলেন।

এরই মধ্যে শনিবার দেবীদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুর গ্রামে ঘটে নতুন এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বাড়ির মালিক ফরিদা ইয়াসমিন (৫০) খুন হয়েছেন। হত্যার পর তাঁর মরদেহ খণ্ডিত করে পলিথিনে প্যাকেট করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পলিথিনে মোড়ানো নয়টি প্যাকেট উদ্ধার করেছে। তবে মাথা ও পা এখনো উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

যেভাবে প্রকাশ পেল নতুন হত্যাকাণ্ড

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের বরাতে জানা যায়, ফরিদা ইয়াসমিন দীর্ঘদিন ধরে ছোট আলমপুর এলাকায় স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাঁর স্বামী মফিজুল ইসলাম জাহাজে চাকরি করেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় ফরিদা বাড়িতে একাই থাকতেন। বাড়ির একটি ঘর ভাড়া দেওয়া হয়েছিল লাইলি আক্তারের কাছে।

শনিবার সকালে ফরিদার মেয়ে মরিয়ম আক্তার বাবার বাড়িতে এসে মাকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে সন্ধ্যার দিকে ফরিদার বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনে পলিথিনের কয়েকটি প্যাকেট দেখতে পান। সন্দেহ হলে তিনি পুলিশকে খবর দেন।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনায় স্থানীয় জনতা ভাড়াটিয়া লাইলি আক্তারকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও কয়েকজনের নাম বলেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে রবিউল, সোহেল, ইমন ও লাইলির স্বামী আবুল কালাম আজাদের নাম রয়েছে। তবে তাদের কারও সম্পৃক্ততার বিষয় এখনো তদন্তাধীন।

কী বলছে পুলিশ?

দেবীদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহের নয়টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। মাথা ও পা এখনো পাওয়া যায়নি। আটক লাইলি আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনায় জড়িত অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে।

হত্যার নেপথ্যে কী?

ফরিদা ইয়াসমিনকে কেন হত্যা করা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল কি না, আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তি, পূর্বশত্রুতা কিংবা অন্য কোনো কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—২০২১ সালের আলোচিত শিশু ফাহিমা হত্যা মামলার লাইলি আক্তার এবং বর্তমান ঘটনায় আটক লাইলি আক্তার কি একই ব্যক্তি?

যদি তারা একই ব্যক্তি হন, তাহলে ছয় বছর আগের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর আবারও একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর নাম কীভাবে সামনে এলো—তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে শুধু একই নামের ভিত্তিতে দুই ব্যক্তিকে একই ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। একই ব্যক্তি কি না, তা পরিচয়, ঠিকানা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পুরোনো হত্যার সঙ্গে নতুন ঘটনার যোগসূত্র আছে কি?

এই মুহূর্তে ২০২১ সালের ফাহিমা হত্যা এবং ফরিদা ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাই দুটি ঘটনাকে একই সূত্রে গাঁথা বা পুরোনো হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা এখনই সমীচীন নয়। নতুন হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের ভূমিকা তদন্তেই পরিষ্কার হবে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং অন্যান্য তদন্তের ফলই বলে দেবে—ফরিদা ইয়াসমিন হত্যার নেপথ্যে আসলে কী ছিল এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত।

পুরোনো একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে একই নাম সামনে আসায় দেবীদ্বারবাসীর মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর এখন তদন্তের দিকেই তাকিয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright © Frilix Group
Theme Customized By BreakingNews