
মোঃ মাসুদ রানা, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি.
টানা ভারী বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গোমতী নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার নদীপাড়ের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। একই সাথে বৃষ্টির কারণে সবজি খেত তলিয়ে যাওয়ায় বাজারেও লেগেছে আগুন।
রবিবার সকাল ৯টায় কুমিল্লা পয়েন্টে গোমতীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেমি উপরে রেকর্ড করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, আসাননগর, চরাঞ্চল ও ময়নামতি সিন্ধুরিয়া পাড় এলাকার নিচু ফসলি জমিতে পানি প্রবেশ করেছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বুড়বুড়িয়ায় বাঁধ ভেঙে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল সেই স্মৃতি এখনো তাড়া করছে স্থানীয়দের। বুড়িচংয়ের কৃষক জাকির হোসেন বলেন, “রাতে ঘুম নাই। বারবার বাঁধ দেখি। পানি আরেকটু বাড়লেই সব শেষ। ঋণ করে ফসল করেছি, আবার বন্যা হলে পথে বসতে হবে।”
কুমিল্লা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, গোমতীর উভয় চরে ২১০ হেক্টর জমির শাকসবজি ঝুঁকিতে আছে। কুমিল্লা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ব্রাহ্মণপাড়াসহ কুমিল্লার বিভিন্ন বাজারে শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এতে ক্রেতারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
গতকাল শনিবার ব্রাহ্মণপাড়া সদর সাপ্তাহিক বাজার, রাজগঞ্জ নিউ মার্কেট, দেবিদ্বার উপজেলা নিউ মার্কেট, নিমসার কাঁচা বাজার ও চান্দিনা বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
বাজারে প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়, গাজর ১৪০ টাকা, করলা ৮০ টাকা এবং বেগুন ১০ টাকা কেজি দরে। প্রতি পিস জালি কুমড়া ৪০ টাকা, লাউ ৬০ টাকা, কাঁচ কলার হালি ৫০ টাকা, ছড়া ৬০ টাকা এবং পটল ৫০ টাকা কেজি।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচ ও শিমের দাম। বাজারে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। আর কয়েকদিন আগে যে কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা কেজি ছিল, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়।
বাজারে তরকারি কিনতে আসা আজাদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কাঁচা মরিচ কিনতে আসলাম, এক পোয়ার দাম চায় ৭০ টাকা! অথচ গত সপ্তাহে এক পোয়া কিনেছি ২০ টাকায়। মরিচ কিনতে এসে তো আমার মাথায় হাত। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই দায়।”
খুচরা তরকারী বিক্রেতা নাজির হোসেন বলেন, “টানা বৃষ্টিতে সবজির জমি তলিয়ে গেছে। খেতের বেশিরভাগ তরকারি নষ্ট হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কম। পাইকারি বাজারেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।”
আরেক ব্যবসায়ী আবু সায়েম বলেন, “আমাদের কেনা বেশি, তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দাম কমার সম্ভাবনা কম।”
ব্রাহ্মণপাড়া সদর বাজারের সভাপতি হাজী মোয়াজ্জেম হোসেন দুলাল বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় সাময়িকভাবে দাম বেড়েছে। কোনো ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সেদিকে নজরদারি রয়েছে।”
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আবদুল মতিন বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে উপজেলার বেশ কিছু নিচু এলাকার সবজি খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতার কারণে সবজি পচে গেছে। আমরা কৃষকদের পানি নিষ্কাশনের পরামর্শ দিচ্ছি। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে সরবরাহ বাড়বে এবং দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৭টি জেলা বন্যা ঝুঁকিতে রয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে বইছে।