
মোঃ মাসুদ রানা ;কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
এক সময় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার প্রকৃতিতে দেশীয় খেজুরগাছ ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য। সড়কের ধারে, বাড়ির আশপাশে, জলাশয়ের পাড় কিংবা পতিত জমিতে বেড়ে ওঠা এসব গাছ শীতকালে রসের উৎসের পাশাপাশি গ্রীষ্ম-বর্ষায় পুষ্টিগুণে ভরপুর দেশীয় খেজুরও দিত।
কিন্তু সময়ের বিবর্তনে গাছ ও ফলের প্রতি অবহেলা, নির্বিচারে গাছ নিধন ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই ফল গাছটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে দেশীয় খেজুরের পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নতুন প্রজন্মসহ সব বয়সের মানুষ।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। টিকে থাকা গাছগুলোর ফলও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচর্যার অভাবে গাছেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারগুলোতেও এখন দেশীয় খেজুরের দেখা মেলে না বললেই চলে। ফলে নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্যবাহী ফলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানার সুযোগ হারাচ্ছে।
শিদলাই ইউনিয়নের পোমকারা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল মতিন বলেন, “আমাদের ছেলেবেলায় বর্ষায় খেজুর পাকলে সমবয়সীরা মিলে গাছে উঠে খেজুর পাড়তাম। পাকা খেজুর ছিল খুবই সুস্বাদু। এখন গাছই কমে গেছে, তাই সেই ফলও আর পাওয়া যায় না।”
সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মাস্টার বলেন, “খেজুরগাছ মানেই শুধু রস আর গুড় নয়। এক সময় এর ফলও ছিল গ্রামের মানুষের পরিচিত ও পুষ্টিকর খাবার। এখন মানুষ বিদেশি ফলের দিকে ঝুঁকছে, আর দেশীয় খেজুর অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে।”
স্থানীয় শিক্ষার্থী মাইমুনা ইসলাম মৌ বলেন, “বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর সহজেই পাওয়া যায়, কিন্তু দেশীয় খেজুর দেখাই যায় না। যে কারণে আমাদের প্রজন্ম এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রকৃতিও হারাচ্ছে ভারসাম্য। এ গাছ সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউনানি মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, “দেশীয় খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করা, খাদ্যআঁশ, আয়রন ও পটাশিয়ামসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি দ্রুত শক্তি যোগায় এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। খেজুর গাছকে শুধু রসের উৎস নয়, মূল্যবান ফলজ গাছ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দেশীয় খেজুরগাছ টিকিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, গাছের উপকারিতা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর পুষ্টিগুণ তুলে ধরা জরুরি। তা না হলে উপজেলার প্রকৃতি থেকে এই পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফল ও এর ঐতিহ্য একসময় বিলীন হয়ে যাবে।