মো: সোহরাওয়ার্দী হোসেন
স্টাফ রিপোর্টার :
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক অধিকার পরিষদ। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি ইমরান খান।
তিনি বলেন, পোশাক শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি কোনো অন্যায্য দাবি নয়। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ এবং সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে তাদের ন্যায্য মজুরি প্রয়োজন। আমরা শ্রমিকদের এই যৌক্তিক দাবির পক্ষে রয়েছি।
তবে শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, গুজব কিংবা ষড়যন্ত্রে পা দেওয়া যাবে না। শ্রমিকদের আবেগ ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কেউ যেন শিল্পকারখানায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
ইমরান খান বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হতে হবে সুসংগঠিত, শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ কিংবা কারখানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং এসব কর্মকাণ্ডের ফলে শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিক পরিবারের ওপরই পড়ে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা জড়িত। দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পোশাক শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। অথচ অনেক শ্রমিককে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংসার পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাসাভাড়া, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই শ্রমিকদের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নতুন সরকারের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান
নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইমরান খান বলেন, শ্রমিকবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিসহ তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমরা নতুন সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতি, শিল্পকারখানা ও শ্রমবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে যে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করবে, তাতে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে আমরা গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। সরকারের সমালোচনা করার পাশাপাশি ভালো উদ্যোগকে স্বাগত জানানো এবং বাস্তবায়নে সহযোগিতা করাও দায়িত্বশীল নাগরিক ও শ্রমিক সংগঠনের কর্তব্য।
মালিক-শ্রমিক-সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
ইমরান খান মনে করেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা—দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে শিল্পে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। একইভাবে শিল্পকারখানায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেও শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে না। তাই আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ন্যায্য কর্মঘণ্টা, ওভারটাইমের যথাযথ পারিশ্রমিক, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য রেশনিং সুবিধা, চিকিৎসাসেবা ও আবাসনব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়েও সরকার ও মালিকপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে।
শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন থাকার আহ্বান
দেশের সব পোশাক শ্রমিকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইমরান খান বলেন, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোন, সংগঠিত থাকুন এবং কোনো ধরনের গুজব বা উসকানিতে বিভ্রান্ত হবেন না। কোনো দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণ করুন। আপনাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমরা পাশে আছি।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমের বিনিময়েই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। তাই শ্রমিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
পরিশেষে তিনি বলেন, আমরা শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির পক্ষে, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং দেশের শিল্প-অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পক্ষে। আমরা চাই শ্রমিকের মুখে হাসি ফুটুক, কারখানায় উৎপাদন সচল থাকুক, দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাক এবং নতুন সরকারের সঙ্গে শ্রমিক সমাজের একটি ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠুক। কোনো উসকানি নয়, সংঘাত নয়—আলোচনা, ঐক্য ও দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়েই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।