“শবনম ভেজা ইয়াদ”
লেখক মোঃ আঃ কুদ্দুস
(সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী)
বিএ (অনার্স) এমএ (বাংলা)
শীতের শেষ বিকেল। আকাশে সূর্যের রক্তিম আলো ধীরে ধীরে মিলাইয়া যাইতেছিল। নগরীর কোলাহল যেন ক্লান্ত হইয়া সন্ধ্যার আঁধারে আশ্রয় লইতেছিল। দূর কোনো মসজিদ হইতে মাগরিবের আজান ভাসিয়া আসিতেছিল, আর সেই সুরে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা জমিয়া উঠিতেছিল আরিবের হৃদয়ে।
জেনারেল হাসপাতালের পুরোনো করিডোরে দাঁড়াইয়া সে নিঃশব্দে জানালার বাইরে তাকাইয়া ছিল। বহু বছর পর আজ তাহার দেখা হইবে রত্নার সঙ্গে—সেই রত্না, যাহাকে একদিন সে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়া ভালোবাসিয়াছিল।
সময় মানুষের জীবনে কত বিচিত্র খেলা খেলে!
একদিন এই মেয়েটিই তাহাকে বলিয়াছিল—
“তুমি ব্যতীত আমার জীবনে যদি আর কেহ আগমন করে, তবে সে হইবে আমার নিয়তির ভয়াবহ আজাব।”
অপু তখন মৃদু হাসিয়াছিল। যুবক বয়সের আবেগ বলিয়া উহাকে উড়িয়ে দিয়াছিল। কে জানিত, নিয়তি একদিন সেই বাক্যকে নির্মম সত্যে পরিণত করিবে!
দরজার ওপাশে শয্যায় শুইয়া ছিল রত্না। সাদা চাদরের মধ্যে তাহাকে বড় অসহায় লাগিতেছিল। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ। অথচ একসময় এই চোখেই ছিল স্বপ্নের নীল আকাশ, এই মুখেই ছিল বসন্তের দীপ্তি।
অপুর মনে পড়িয়া গেল বহু পুরোনো দিনের কথা।
তখন তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ক্যাম্পাসের পুরোনো কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করিত। রত্না কবিতা ভালোবাসিত, আর অপু তাহার জন্য বইয়ের পাতায় পাতায় প্রেমের পঙ্ক্তি খুঁজিয়া আনিত।
বর্ষার দিনে ভিজিয়া ভিজিয়া ক্যাম্পাসের লেকের ধারে হাঁটিত তাহারা। কখনো রত্না বলিত—
“যদি কোনোদিন তুমি হারাইয়া যাও, আমি বাঁচিব না।”
অপু হাসিয়া বলিত—
“আমি কোথাও যাইব না। মানুষ নিজের আত্মা হইতে পালাইতে পারে না।”
সেই দিনগুলো যেন এখন রূপকথা।
বাস্তবতা খুব নির্মম ছিল।
রত্নার পরিবার ছিল অভিজাত, ধর্মীয়ভাবে কঠোর এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অন্যদিকে অপু ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের এক স্বপ্নবাজ যুবক। তাহার ছিল না বিপুল সম্পদ, না সামাজিক প্রভাব।
প্রথম দিকে রত্না সাহস দেখাইয়াছিল। পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার কথাও বলিয়াছিল। কিন্তু সময় যত গড়াইল, চারপাশের চাপ তত বাড়িতে লাগিল।
একদিন সন্ধ্যায় রত্না কাঁদিতে কাঁদিতে বলিয়াছিল—
“আমরা একে অপরকে খুব ভালোবাসি, কিন্তু আমাদের সমাজ ভালোবাসার ভাষা বোঝে না।”
সেদিন অপুর কিছু বলিতে পারে নাই। শুধু আকাশের দিকে তাকাইয়া ছিল। মনে হইয়াছিল, যেন সমস্ত পৃথিবী তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া আছে।
তারপর একদিন হঠাৎ রত্নার বিয়ের সংবাদ আসিল।
সেই রাতটি অপু কোনোদিন ভুলিতে পারে নাই।
আকাশে প্রবল ঝড় উঠিয়াছিল। বৃষ্টির শব্দে জানালা কাঁপিতেছিল। আরিব একা বসিয়া ছিল অন্ধকার ঘরে। মনে হইয়াছিল, বুকের ভিতর কেউ ধীরে ধীরে সমস্ত আলো নিভাইয়া দিতেছে।
তবুও সে রত্নার জন্য আর্শিবাদ করিয়াছিল।
সে চাহিয়াছিল, মেয়েটি সুখী হউক। তাহার সংসারে হাসি ফুটুক। শিশুর কলতানে ঘর ভরিয়া উঠুক। সন্ধ্যার প্রদীপে আলোকিত হউক তাহার জীবন।
কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর
বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই রত্নার জীবনে নেমে আসে অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা। বাহ্যিক ঐশ্বর্য থাকিলেও সেখানে ছিল না শান্তি। স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব বাড়িতে বাড়িতে একসময় তাহা নীরব যন্ত্রণায় পরিণত হয়।
যে ঘরে হাসির জোয়ার উঠিবার কথা ছিল, আজ সেখানে জমিয়া থাকে দীর্ঘশ্বাসের ধোঁয়া।
যে নয়নে সুখের রঙিন খোয়াব সাজিবার কথা ছিল, আজ সেখানে বোবা কান্নার অশ্রু।
অপু এসব খবর দূর হইতে শুনিত, কিন্তু কখনো যোগাযোগ করে নাই। কারণ সে জানিত—কিছু সম্পর্কের মৃত্যু ঘটিলেও স্মৃতি মরিয়া যায় না।
আজ বহু বছর পর হঠাৎ হাসপাতাল হইতে ফোন আসিল।
রত্না তাহার সঙ্গে দেখা করিতে চাহিয়াছে।
অপু প্রথমে যাইতে চায় নাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হৃদয়ের টান উপেক্ষা করিতে পারে নাই।
রত্না ধীরে চোখ তুলিয়া তাহার দিকে তাকাইল।
—“তুমি এখনো আগের মতোই আছ।”
অপু মৃদু হাসিল।
—“সময় কাউকেই আগের মতো রাখে না।”
রত্না কিছুক্ষণ নীরব থাকিল। তারপর ধীরে বলিল—
“জানো, মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যদি একটু সাহসী হতাম…”
কথা শেষ করিবার আগেই তাহার চোখ ভিজিয়া উঠিল।
অপু চুপ করিয়া রহিল। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর তাহার জানা নাই।
মানুষ কি সত্যিই নিজের ভাগ্যের বিরুদ্ধে জয়ী হইতে পারে?
হয়তো পারে না।
বাইরে তখন বৃষ্টি নামিতে শুরু করিয়াছে। হাসপাতালের জানালায় জলের ফোঁটা গড়াইয়া পড়িতেছে। দূরে আজানের সুর ভাসিতেছে।
সেই মুহূর্তে আরিবের মনে হইল, প্রেম আসলে এক ধরনের ইবাদত—যেখানে মানুষ প্রার্থনা করে, কিন্তু সব দোয়া কবুল হয় না।
রত্না হঠাৎ বলিল—
“তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?”
অপু বিস্মিত চোখে তাকাইল।
—“ঘৃণা? যাহাকে সত্যিকার ভালোবাসা যায়, তাহাকে কখনো ঘৃণা করা যায় না।”
রত্না নিঃশব্দে কাঁদিতে লাগিল।
অপুর বুকের ভিতর হাহাকার উঠিল। কিন্তু সে জানিত, এই কান্না থামানোর কোনো অধিকার আজ তাহার নাই।
কারণ ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে সবচেয়ে কাছের হয়েও সবচেয়ে দূরের করিয়া দেয়।
রাত গভীর হইয়া আসিল।
বিদায়ের সময় রত্না ধীরে বলিল—
“হয়তো এটাই আমাদের শেষ দেখা।”
অপু উত্তর দিল না।
সে শুধু রত্নার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকাইয়া রহিল। মনে হইল, যেন বসন্তের শেষ ফুলটিও আজ ঝরিয়া পড়িতেছে।
দরজার কাছে পৌঁছাইয়া সে থামিল।
পেছন হইতে রত্না কণ্ঠ ভাসিয়া আসিল—
“আরিব…”
সে ফিরিয়া তাকাইল।
রত্না মৃদু হাসিয়া বলিল—
“ভালো থেকো।”
অপুর চোখ ভিজিয়া উঠিল। তবুও সে হাসিবার চেষ্টা করিল।
—“তুমিও।”
তারপর সে ধীরে ধীরে করিডোর পার হইয়া অন্ধকার রাতের মধ্যে হারাইয়া গেল।
সেই রাতের পর আর কখনো তাহাদের দেখা হয় নাই।
কিন্তু আজও নিশীথ রাতের নির্জনতায়, যখন আকাশে চাঁদ মেঘের কাফনে ঢাকিয়া যায়, যখন বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ ভাসে—আরিবের মনে পড়ে সেই মুখ, সেই কণ্ঠ, সেই অসমাপ্ত ভালোবাসা।
আর দূর কোনো অন্ধকার প্রহরে সে নিঃশব্দে ভাবে—
“এমনটি হওয়ার কথা ছিল না…”
কিন্তু তাকদির বড় বেদর্দ।
সে কখনো মানুষকে প্রেম দেয়,
কিন্তু মিলন দেয় না—
শুধু দেয় শবনমভেজা স্মৃতির এক নীরব তুরবত।