সাংবাদিক মোঃ আঃ কুদ্দুস (মানবাধিকারের কমী) বিএ অনার্স (বাংলা) এমএ;
রাশেদ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। ভোরের আলো ধীরে ধীরে অন্ধকার সরিয়ে দিচ্ছে। অথচ তার মনের ভেতর জমে থাকা বিষণ্নতার রাত যেন কিছুতেই শেষ হতে চাইছে না।
তার বারবার মনে পড়ছিল, মানুষটি যখন কাছে ছিল, তখন কত সহজেই তার অভিমানকে অবহেলা করেছে সে। কতবার মানুষটি একটু সময় চেয়েছে, আর সে ব্যস্ততার অজুহাতে সেই সময়টুকুও দিতে পারেনি। কতবার ওপাশের নীরবতাকে অভিমান বলে উড়িয়ে দিয়েছে, বুঝতে পারেনি—সেই নীরবতার আড়ালে হয়তো জমে উঠছিল শেষবারের মতো দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
আজ সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই রাশেদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি অবহেলা যেন অতীত থেকে ফিরে এসে তাকে প্রশ্ন করছে—যে মানুষটি তোমার কাছে একটু বোঝাপড়া, একটু যত্ন আর একটু মানসিক শান্তি চেয়েছিল, তাকে তুমি সেটুকুও দিতে পারলে না কেন?
কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার মতো কোনো যুক্তিই আজ তার কাছে যথেষ্ট মনে হয় না।
একসময় সে ভাবত, ভালোবাসা আছে যখন, তখন মানুষটি কোথাও যাবে না। অভিমান করবে, কষ্ট পাবে, হয়তো কিছুদিন কথা বলবে না—তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। সে বুঝতে পারেনি, সম্পর্ক ভাঙে সব সময় একটি বড় ঘটনার কারণে নয়; কখনো কখনো প্রতিদিনের সামান্য অবহেলা, না-বলা কষ্ট আর উপেক্ষিত অনুভূতি জমতে জমতেই ভালোবাসার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়।
মানুষটি চলে যাওয়ার পর রাশেদ বুঝেছে, কাউকে হারানোর অর্থ শুধু তার অনুপস্থিতিতে অভ্যস্ত হওয়া নয়; বরং প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট মুহূর্তে তার অভাব অনুভব করা। কোনো কথা বলার সময় মনে হওয়া, কথাটি তাকে বলা যেত। কোনো ভালো খবর পেয়ে হঠাৎ মনে পড়া, মানুষটি থাকলে হয়তো সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। আবার কোনো গভীর রাতে নিজের ভুলগুলো মনে পড়ে যাওয়া এবং উপলব্ধি করা—যার কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছে, তার কাছেই হয়তো আর পৌঁছানো যাবে না।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় এই ভেবে যে, মানুষটি হয়তো একসময় তার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হয়তো বহুবার ভেবেছিল, এবার রাশেদ বুঝবে। হয়তো প্রতিবারই একটু আশা নিয়ে ফিরে এসেছিল, আর প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে হতাশ হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি হয়তো এক দিনে নেয়নি সে; হয়তো রাশেদের অজান্তেই নিজের ভেতরে বহুদিন ধরে বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়েছিল।
এই উপলব্ধি রাশেদকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। কারণ, সে মানুষটিকে হারানোর আগেই তার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল—অথচ তখনও তা বুঝতে পারেনি।
টেবিলের কাছে ফিরে এসে রাশেদ ডায়েরির ভেতর রাখা চিঠিটি বের করল। আবার পড়ল নিজের লেখা প্রতিটি লাইন। তারপর কলম হাতে নিয়ে নিচে আরও কয়েকটি কথা লিখল—
‘জানো, আজকাল একটা কথা খুব মনে হয়। তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ যদি কোনো দিন না-ও পাই, তবু আমার ভুলগুলোকে ভুল বলে স্বীকার করাটা জরুরি। কারণ, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি—এই সত্যকে শুধু আমার অনুশোচনার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চাই না।
আমি জানি না, তোমার জীবনে আমার স্মৃতি এখনো কষ্ট দেয় কি না। হয়তো তুমি অনেক দূর এগিয়ে গেছ, হয়তো আমার কথা আর মনেও পড়ে না। আমি চাই না, আমার এই অনুশোচনা তোমার জীবনে নতুন করে কোনো অশান্তি ফিরিয়ে আনুক।
শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি সময় থাকতে বুঝতে পারতাম, তাহলে হয়তো তোমাকে এতটা কষ্ট পেতে হতো না। তোমার কথা একটু বেশি শুনলে, তোমার অভিমানকে একটু বেশি গুরুত্ব দিলে, নিজের ভুলগুলো একটু আগে শুধরে নিলে—হয়তো আজ আমাদের সম্পর্কের পরিণতি অন্য রকম হতে পারত।
আমি জানি, এসব ভেবে এখন আর কিছু বদলানো যাবে না। তবু যে ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সুযোগ আমার হাতে ছিল, সেগুলো শুধরে নিতে পারিনি—এই আক্ষেপটা সহজে মেনে নিতে পারি না।
তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার অধিকার আমার নেই। তোমাকে ক্ষমা করতেই হবে, এমন প্রত্যাশাও নেই। শুধু চাই, তুমি এমন একটি জীবন পাও, যেখানে নিজের কষ্ট বোঝানোর জন্য বারবার তোমাকে ক্লান্ত হতে হবে না; যেখানে তোমার নীরবতাও কেউ গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, তোমার অভিমানকে কেউ তুচ্ছ ভাববে না।
আমি তোমাকে সেই শান্তিটুকু দিতে পারিনি। এখন অন্তত তোমার শান্তির পথে বাধা হয়ে থাকতে চাই না।
পারলে কোনো দিন আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর যদি না-ও পারো, তোমার সেই সিদ্ধান্তের জন্য তোমাকে দোষ দেব না। কারণ, তোমার কষ্টের অভিজ্ঞতা তোমার, আর আমার ভুলের দায় আমারই।’
চিঠি লেখা শেষ করে রাশেদ অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। চোখের সামনে ভেসে উঠল মানুষটির মুখ, তার হাসি, তার অভিমান, আর সেই শেষ কথাটি—‘আমি তোমার কাছে একটু শান্তি চেয়েছিলাম, রাশেদ। আর কিছু নয়।’
সেদিন প্রথমবার রাশেদ বুঝল, তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা মানুষটিকে হারানো নয়; বরং মানুষটি পাশে থাকতে যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তা সময় থাকতে বুঝতে না পারা।
চিঠিটি সে খামে ভরল না। কোনো ঠিকানাও লিখল না। ডায়েরির ভেতরে রেখে দিল নিঃশব্দে। কারণ, সে আর নিজের অপরাধবোধের ভার মানুষটির কাঁধে তুলে দিতে চায় না। ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা তার আছে, কিন্তু সেই ইচ্ছার কারণে অন্য মানুষটির জীবনে আবারও অশান্তি তৈরি করার অধিকার তার নেই।
জানালার বাইরে তখন নতুন দিনের আলো। রাশেদ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার মনে কোনো প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন নেই, নেই সবকিছু আগের মতো হয়ে যাওয়ার দাবি। আছে শুধু নিজের ভুলগুলো থেকে শেখার একটি কঠিন প্রতিজ্ঞা—জীবনে আর কখনো কারও অনুভূতিকে এতটা অবহেলা করবে না, ভালোবাসার মানুষটির নীরবতাকে আর কখনো গুরুত্বহীন ভাববে না।
তবু একটি আক্ষেপ হয়তো কোনো দিনই পুরোপুরি মুছে যাবে না। কারণ, মানুষ নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে, নিজেকে বদলাতেও পারে; কিন্তু অতীতে ফিরে গিয়ে কাউকে দেওয়া কষ্টগুলো ফিরিয়ে নিতে পারে না।
রাশেদ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে শেষবারের মতো বলল—
‘ভালো থেকো। তোমার জীবনে যে শান্তিটুকু দিতে পারিনি, জীবন যেন তোমাকে তার চেয়েও বেশি শান্তি দেয়। তুমি যেন আর কখনো ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজের কষ্ট বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত হয়ে না পড়ো। তোমার নীরবতাও যেন কেউ বুঝতে শেখে, তোমার চোখের আড়ালে জমে থাকা কষ্টগুলোও যেন কেউ দেখতে পায়।
আমি জানি না, কোনো দিন তোমার ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য হতে পারব কি না। শুধু জানি, তোমাকে কষ্ট দিয়েছিলাম—এই সত্য অস্বীকার করে আর বাঁচতে চাই না।’
বাইরে পাখিরা ডাকছিল। শহর জেগে উঠছিল নতুন দিনের ব্যস্ততায়। অথচ রাশেদের ডায়েরির ভেতরে পড়ে রইল একটি না-পাঠানো চিঠি—যেখানে লেখা ছিল এমন এক মানুষের অনুতাপ, যে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে ভালোবাসার মূল্য, কিন্তু সেই উপলব্ধি কাজে লাগানোর সুযোগটি হারিয়ে ফেলেছে।
কিছু বিচ্ছেদ মানুষকে নিঃসঙ্গ করে, আর কিছু বিচ্ছেদ তাকে নিজের ভুলের সামনে দাঁড় করায়। রাশেদের জীবনে এই বিচ্ছেদ ছিল তেমনই—যেখানে প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার চেয়ে তার কষ্টের কারণ হয়ে ওঠার সত্য মেনে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন।
আর তার হৃদয়ে আজীবনের জন্য থেকে গেল একটি বাক্য—
‘তোমাকে হারানোর জন্য শুধু সময়কে দোষ দিতে পারি না; কারণ, যে সময়টুকু তোমাকে বোঝার জন্য আমার হাতে ছিল, সেই সময়ের যথার্থ মূল্য আমি বুঝিনি। তোমাকে সেই শান্তিটুকু দিতে পারিনি, যে শান্তি তোমার প্রাপ্য ছিল—আর এই অনুশোচনাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে নীরব, অথচ গভীরতম দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকবে।’