সাংবাদিকদের একাল-সেকাল: আদর্শ থেকে প্রযুক্তির যুগে, কতটা বদলেছে সাংবাদিকতা?
কলম, ক্যামেরা আর সত্যের লড়াই—সময় বদলেছে, বদলেছে সাংবাদিকতার ধরন; কিন্তু দায়িত্ব কি বদলেছে?
বিশেষ সম্পাদকীয়;
একসময় সাংবাদিকতা ছিল সাহস, সততা, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য পেশা। হাতে কলম, কাঁধে ব্যাগ, পকেটে ছোট্ট নোটবুক আর সত্য অনুসন্ধানের অদম্য স্পৃহা নিয়ে সাংবাদিকেরা ছুটে বেড়াতেন শহর থেকে গ্রামে, হাটবাজার থেকে প্রত্যন্ত জনপদে। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কখনো পোহাতে হতো দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, কখনো সহ্য করতে হতো প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু, আবার কখনো সত্য প্রকাশের কারণে নেমে আসত হুমকি-ধমকি ও নানা প্রতিকূলতা। তবুও অনেক সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে আসতেন না।
সময়ের পরিবর্তনে আজ সাংবাদিকতার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, ইন্টারনেট, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদ প্রকাশকে করেছে দ্রুততর। একসময় একটি সংবাদ পাঠকের হাতে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো এক দিনও লেগে যেত। এখন একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের কাছে। মোবাইল ফোনই এখন অনেক সাংবাদিকের ক্যামেরা, নোটবুক ও সংবাদ পাঠানোর মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সংবাদ প্রকাশের গতি বাড়লেও সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা কি একই গতিতে এগিয়েছে?
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা অনেকের কাছে পেশা, অনেকের কাছে নেশা, আবার কারও কারও কাছে পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে উঠেছে—এমন অভিযোগও শোনা যায়। অবশ্য এই চিত্র দিয়ে সব সাংবাদিককে বিচার করা যায় না। এখনো অসংখ্য সাংবাদিক সীমিত সুযোগ-সুবিধা, স্বল্প পারিশ্রমিক ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসম্পূর্ণ তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা পেশাটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
সাংবাদিকতার পরিচয় বহন করা আর প্রকৃত অর্থে সাংবাদিক হওয়া এক বিষয় নয়। সাংবাদিকতার মূল শক্তি পরিচয়পত্রে নয়, বরং তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের আস্থায়।
আগের দিনের অনেক সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের আগে ঘটনাস্থলে যেতেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য নিতেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তথ্য যাচাই করে সংবাদ তৈরি করতেন। তাঁদের কাছে সংবাদ ছিল জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব।
বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে সংবাদ সংগ্রহ সহজ হয়েছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতার সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। ফেসবুক পোস্ট, অপরিচিত সূত্রের বক্তব্য কিংবা সম্পাদিত ভিডিও দেখে যাচাই ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ করলে একজন নিরপরাধ মানুষ সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ভুল সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরে সংশোধনী প্রকাশ করেও সেই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
তাই প্রযুক্তি সাংবাদিকতার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সত্য যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না।
সংবাদমাধ্যম পরিচালনার জন্য অর্থ প্রয়োজন। সংবাদকর্মীদের বেতন, যাতায়াত, প্রযুক্তি ও সংবাদ সংগ্রহের ব্যয় বহন করতে হয়। বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য বৈধ আয়ের ব্যবস্থা থাকাও স্বাভাবিক।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন বাণিজ্যিক স্বার্থ সংবাদ প্রকাশের নীতি নির্ধারণ করতে শুরু করে; যখন বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয় বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করা হয়। একইভাবে, সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করে কারও কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিবেচনা করা জরুরি।
একটি সংবাদমাধ্যমের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই স্থিতিশীলতার বিনিময়ে সত্য ও জনস্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হলে সাংবাদিকতার মৌলিক উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিকতার ঝুঁকি শুধু অতীতের বিষয় নয়। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের অনেকেই সীমিত বেতন, অনিশ্চিত চাকরি, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং পেশাগত নিরাপত্তার উদ্বেগ নিয়ে কাজ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের পর হুমকি, হয়রানি কিংবা হামলার আশঙ্কাও থাকে।
বিশেষ করে জেলা, উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ের সাংবাদিকেরা স্থানীয় অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনদুর্ভোগের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা চাপের মুখে পড়তে পারেন। অথচ তাঁদের অনেকের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার সুযোগ সীমিত।
সাংবাদিকের দায়িত্ব যেমন সত্য প্রকাশ করা, তেমনি সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইনসম্মতভাবে তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।
সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
1. তথ্য যাচাই: সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য, নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করতে হবে।
2. নৈতিকতা বজায় রাখা: ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় আনুগত্য কিংবা আর্থিক প্রলোভন যেন সংবাদ পরিবেশনে প্রভাব না ফেলে।
3. ভুল স্বীকার ও সংশোধন: সংবাদে ভুল হলে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সংশোধনী প্রকাশ করতে হবে।
4. যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ: সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পেশাগত নীতিমালা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে হবে।
5. সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার: যথাযথ পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
6. জনগণের আস্থা অর্জন: সংবাদকে ব্যক্তিগত বিরোধ, অপপ্রচার কিংবা স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার না বানিয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সাংবাদিকতার একাল-সেকালের পার্থক্য শুধু কলম থেকে কম্পিউটার কিংবা ছাপাখানা থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত পার্থক্য তৈরি হয় সাংবাদিকতার মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও চর্চার মধ্য দিয়ে।
আগের দিনের সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও অনুসন্ধানী মনোভাব থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। আবার বর্তমান সময়ের প্রযুক্তি, দ্রুত সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগকেও কাজে লাগাতে হবে। অতীতের সবকিছু আদর্শ ছিল না, বর্তমানের সবকিছু খারাপও নয়। প্রয়োজন হলো অতীতের ইতিবাচক মূল্যবোধের সঙ্গে বর্তমানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সমন্বয়।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদবি নয়, তাঁর সততা। সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর পরিচয়পত্র নয়, মানুষের বিশ্বাস। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রশংসা পাওয়া নয়, বরং সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
সাংবাদিকতা যদি মানুষের কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে এবং ক্ষমতার কাছে জবাবদিহি দাবি করে, তবেই এই পেশার প্রকৃত মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে। সময় বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম বদলাবে—কিন্তু সাংবাদিকতার প্রাণ হয়ে থাকতে হবে সত্য, সাহস ও সততা।
— সম্পাদকীয় বিভাগ, দৈনিক বাংলার আলো