বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ :
ভাঙ্গুড়ায় ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল ১০ বছরের শিশু সামিউলের; মোংলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে কোস্টগার্ড ডিজির শুভেচ্ছা বিনিময়; মোহনপুর মডেল মসজিদে ইমাম নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, ইউএনওর কাছে অভিযোগ; নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববেন না, সবার সমান অধিকার রয়েছে’— স্বাস্থ্যমন্ত্রী; পদ্মায় নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মা ইলিশ শিকারের দায়ে ১৮ জেলের কারাদণ্ড, জাল ধ্বংস; কাউখালীতে মন্দিরের মাঠসংলগ্ন গাছে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার; শারদীয় দুর্গোৎসব ও জনসভা উপলক্ষে রাজশাহী পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল; একদিনের পরিচয়, সারাজীবনের অপমান; গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়ে নওগাঁর আত্রাইয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের লিফলেট বিতরণ; এফডিইবি লালমনিরহাট জেলা কমিটি গঠন: সভাপতি নুরে আলম, সম্পাদক সেলিম রেজা; যুক্তরাষ্ট্রে কুমিল্লা বিভাগীয় জাতীয়তাবাদী ফোরাম গ‌ঠিত; বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা: কৃষকের নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে গভীর নলকূপ ; সংবাদ প্রকাশের পর জামালপুরে শিক্ষকের বেতন বন্ধ; এনসিপির” এনায়েতপুর থানা আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন; মনোহরদীতে এক রাতেই ৮ গরু চুরি, আতঙ্কে খামারি ও গৃহস্থরা; নওগাঁর আত্রাইয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ সংকট, ভোগান্তিতে রোগীরা; সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার তাফসির মাহফিল স্থগিত; দুর্গোৎসবে কোটি টাকার আয়োজন; সাংবাদিকদের হেনস্তার জন্য দায়ী কি সাংবাদিকরাই?

একদিনের পরিচয়, সারাজীবনের অপমান;

  • Update Time : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ বার পঠিত




যৌনকর্মীদের জন্য কি সমাজে দ্বিতীয়বার বাঁচার কোনো অধিকার নেই?”

সাংবাদিক মোঃ আঃ কুদ্দুস
(মানবাধিকার কর্মী ),বিএ (অনার্স) বাংলা এম.এ
fair.medecin@gmail.com

একজন নারী কি সারা জীবন তাঁর অতীতের পরিচয় বহন করতে বাধ্য? জীবনের কোনো এক পর্যায়ে যৌনপল্লিতে বসবাস করেছেন বলে কি তাঁর জন্য অন্য পেশায় যাওয়া, নিজের সংসার গড়া, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া কিংবা সম্মানের সঙ্গে বার্ধক্য কাটানোর পথ বন্ধ হয়ে যাবে? তিনি যদি নতুন করে জীবন শুরু করতে চান, তাহলে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার কি তাঁকে সেই সুযোগ দেবে? নাকি মুখে মানবিকতার কথা বলেও বাস্তবে তাঁর সামনে একের পর এক দরজা বন্ধ করে রাখা হবে?
প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু যৌনপল্লির নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিকার অর্থে আলোচনা করতে হলে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
যৌনপল্লির জীবন নিয়ে সমাজের কৌতূহল আছে, নৈতিক বিচার আছে, ধর্মীয় বিতর্ক আছে। কিন্তু এই নারীদের বিকল্প জীবিকা, নিরাপদ আশ্রয়, সামাজিক পুনর্বাসন এবং বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কী করা হচ্ছে—সেই প্রশ্নে জনপরিসরের আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। এই ব্যবধানই নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।
১. মুক্তির কথা বলা সহজ, মুক্তির পথ তৈরি করা কঠিন
যৌনকর্মে যুক্ত কোনো নারী যদি পেশা পরিবর্তন করতে চান, তাহলে তাঁর প্রথম প্রয়োজন একটি বাস্তব বিকল্প। কিন্তু বিকল্প বলতে শুধু সেলাই প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ কিংবা কয়েক দিনের কর্মশালা বোঝায় না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তিনি নিয়মিত আয় করতে পারবেন, বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারবেন, সন্তানদের দেখাশোনা করতে পারবেন এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারবেন।
ধরা যাক, একজন নারী বহু বছর যৌনপল্লিতে কাজ করেছেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত, সঞ্চয় নেই, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তিনি পেশা ছাড়তে চান। কিন্তু নতুন কাজের আয় দিয়ে বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে শুধু বলা—‘এই পেশা ছেড়ে দিন’—কতটা বাস্তবসম্মত?
এখানেই নীতিনির্ধারণের পরীক্ষা।
রাষ্ট্র যদি বিকল্প জীবিকার কথা বলে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: প্রশিক্ষণের পর চাকরি কোথায়? কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কী? প্রাথমিক পুঁজি কোথা থেকে আসবে? নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা কে করবে? ছয় মাস বা এক বছর পর তাঁর জীবন কেমন আছে, তা কে মূল্যায়ন করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি কাগজে সুন্দর শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনে তা কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত থেকে যায়।
২. রাষ্ট্র কি শুধু পেশা ছাড়তে বলবে, নাকি নতুন জীবন গড়তেও সাহায্য করবে?
যৌনকর্মীদের পেশা পরিবর্তনের আহ্বান জানানো সহজ। কিন্তু সেই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য বহন করার ব্যবস্থা না থাকলে আহ্বানটি কার্যকর নীতিতে পরিণত হয় না।
সরকারের কাছে তাই কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত:
পেশা পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক নারীদের জন্য কতটি কার্যকর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে?
প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কতজন নিয়মিত আয় করতে পারছেন?
নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সন্তানদের শিক্ষার জন্য কী ধরনের সহায়তা রয়েছে?
পাচার বা জবরদস্তির শিকার নারীদের জন্য সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কতটা সহজলভ্য?
পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি মূল্যায়নের কোনো ব্যবস্থা আছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সরকারি তথ্য, বাজেট, কর্মসূচির ফলাফল এবং স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার: প্রত্যেক যৌনকর্মী পেশা ছাড়তে চান—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান—এমন ধারণাও যথার্থ নয়। নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত জবরদস্তি ও শোষণ থেকে মুক্তি নিশ্চিত করা এবং যাঁরা পরিবর্তন চান, তাঁদের সামনে বাস্তব পথ খুলে দেওয়া।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তির হয়ে তাঁর জীবন বেছে নেওয়া নয়; বরং তিনি যেন ভয়, প্রতারণা, দারিদ্র্য কিংবা জবরদস্তির কারণে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা।
৩. সমাজের দ্বিচারিতা: সেবা গ্রহণে আপত্তি নেই, স্বীকৃতি দিতে আপত্তি কেন?
যৌনপল্লিকে ঘিরে সামাজিক মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রহণ ও বর্জনের বৈপরীত্য। যৌনকর্মের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যৌনকর্মীদের সামাজিক পরিচয় প্রায়ই কলঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই বৈপরীত্যের মাত্রা ও কারণ নিয়ে নির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন, তবে এটি সামাজিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যে নারী আজ পেশা পরিবর্তন করে অন্য কাজে যুক্ত হতে চান, তাঁর অতীত পরিচয় জানাজানি হলে কি তাঁকে চাকরি দেওয়া হবে? বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে? সন্তানকে কি বৈষম্য ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রহণ করা হবে? সামাজিক সম্পর্ক গড়তে গেলে তাঁকে কি বারবার নিজের অতীতের ব্যাখ্যা দিতে হবে?
যদি উত্তরগুলো নেতিবাচক হয়, তাহলে পেশা পরিবর্তনের পরও তাঁর জন্য নতুন জীবনে প্রবেশের পথ সংকুচিত থেকে যায়।
এখানে সমাজের কাছে প্রশ্ন: একজন মানুষকে পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও তাঁর সামনে যদি কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামাজিক সম্পর্কের দরজা বন্ধ থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তন বাস্তবে কীভাবে সম্ভব?
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মানে কারও সব সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। এর অর্থ হলো, তাঁর অতীতের কারণে তাঁকে অনির্দিষ্টকাল অপমানিত বা বৈষম্যের শিকার হতে না দেওয়া। কাউকে নিজের ব্যক্তিগত ইতিহাস প্রকাশ করতে বাধ্য না করাও এই মর্যাদার অংশ।
৪. যৌনপল্লি কি শুধু নারীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প?
যৌনপল্লির প্রতিটি নারীর অভিজ্ঞতা এক নয়। কেউ প্রতারণা বা পাচারের শিকার হতে পারেন, কেউ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, আবার কেউ নিজের সিদ্ধান্তে যৌনকর্মে যুক্ত থাকতে পারেন। তাঁদের সবাইকে একইভাবে অসহায় বা একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হিসেবে বর্ণনা করলে বাস্তবতার জটিলতা আড়াল হয়ে যায়।
কিন্তু এটিও সত্য যে কোনো ব্যক্তি যদি দারিদ্র্য, নির্যাতন, সামাজিক বর্জন কিংবা বিকল্প জীবিকার অভাবে নিজের পছন্দের পরিসর হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনের পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
এখানে ব্যক্তিগত দায়িত্বের আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বাদ দেওয়া যায় না।
একজন মানুষ কীভাবে একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছালেন, কেন সেখানে রয়ে গেলেন এবং বেরিয়ে আসতে চাইলে কী বাধার মুখে পড়েন—এসব না বুঝে শুধু তাঁর বর্তমান পরিচয়কে বিচার করা বিশ্লেষণের পরিবর্তে নৈতিক রায় দেওয়ার শামিল।
৫. ধর্মীয় মূল্যবোধ কি নতুন জীবনের দরজা খুলবে, নাকি সামাজিক বর্জন বাড়াবে?
বাংলাদেশের সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রভাব গভীর। ইসলামি শিক্ষায় তওবা, আত্মসংশোধন এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সেই আলোকে কেউ অতীতের জীবন পরিবর্তন করতে চাইলে তাঁর সামনে সহায়তা ও নতুনভাবে শুরু করার পথ তৈরি করা ধর্মীয় ও সামাজিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় বক্তব্যের সঙ্গে সামাজিক আচরণের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?
কোনো নারী পেশা ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে চাইলে তাঁকে কাজ পেতে সাহায্য করা, তাঁর সন্তানদের শিক্ষায় সহযোগিতা করা, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা কিংবা সামাজিক অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—এসব কি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের অংশ হতে পারে না?
ধর্মীয় মূল্যবোধের সামাজিক প্রয়োগ কেবল নিষেধাজ্ঞা বা নৈতিক সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে পুনর্বাসনের বাস্তব সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাদের বাস্তব উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যও প্রয়োজন।
এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত কাউকে তাঁর অতীত দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে চিহ্নিত করা নয়; বরং আত্মসংশোধন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা।
৬. যাঁরা পেশা ছাড়তে চান না, তাঁদের অধিকার কি কম?
এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলে বিশ্লেষণ একপেশে হয়ে পড়বে।
পুনর্বাসনের আলোচনা অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি করে যে যৌনকর্মে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত পেশা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু সব প্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মী একই সিদ্ধান্ত নেন না। কেউ পেশা পরিবর্তন করতে চান, কেউ চান না, আবার কারও সামনে বাস্তব বিকল্প সীমিত।
সুতরাং পেশা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা এবং পেশায় থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখা উচিত নয়।
যাঁরা পেশা ছাড়তে চান, তাঁদের জন্য বিকল্প জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন। আর যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে পেশায় থাকতে চান, তাঁদেরও সহিংসতা, জবরদস্তি, শোষণ এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা পাওয়া জরুরি। কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা প্রযোজ্য আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিবেচিত হবে।
এটাই অধিকারভিত্তিক নীতির মৌলিক পরীক্ষা—সহায়তা যেন ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো নির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতিতে পরিণত না হয়।
৭. সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন: বার্ধক্যে তাঁদের পাশে কে থাকবে?
যৌনপল্লির জীবন নিয়ে আলোচনা প্রায়ই বর্তমান জীবিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নও রয়েছে।
বয়স বাড়লে কাজ করার সামর্থ্য কমতে পারে। অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে বা সন্তানদের সহায়তা না পেলে আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এসব পরিস্থিতিতে একজন নারী কোথায় থাকবেন, কীভাবে চিকিৎসা পাবেন, তাঁর আয়ের উৎস কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার।
এটি শুধু যৌনকর্মীদের সমস্যা নয়; পরিবারহীন, দরিদ্র ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের জন্যও একই ধরনের সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে যৌনপল্লির বাসিন্দাদের নির্দিষ্ট ঝুঁকি ও প্রয়োজন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।
রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা তাঁদের কাছে পৌঁছায়, প্রবীণ ও অসুস্থ নারীদের জন্য কী সহায়তা রয়েছে এবং মৃত্যুর পর পরিচয় ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
৮. প্রকৃত পুনর্বাসনের মানদণ্ড কী হওয়া উচিত?
পুনর্বাসনের সাফল্য শুধু কতজন নারী যৌনপল্লি ছেড়েছেন, সেই সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত নয়। কারণ কেউ পেশা ছেড়েও দারিদ্র্য, গৃহহীনতা বা নির্যাতনের মধ্যে পড়তে পারেন। আবার কেউ পেশায় থেকেও নিজের নিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে পারেন।
কার্যকর মূল্যায়নে কয়েকটি বিষয় দেখা জরুরি:
ব্যক্তির সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছামূলক ছিল কি না।
তিনি স্থিতিশীল ও নিরাপদ আয়ের সুযোগ পেয়েছেন কি না।
বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কি না।
সন্তানদের শিক্ষা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে কি না।
সামাজিক বৈষম্য ও সহিংসতার ঝুঁকি কমেছে কি না।
দীর্ঘমেয়াদে তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না।
এ ধরনের মূল্যায়ন ছাড়া পুনর্বাসনের প্রকৃত ফলাফল বোঝা কঠিন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত কর্মসূচির ফলাফল সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা।
উপসংহার: অতীতের পরিচয় কি ভবিষ্যতের ওপর আজীবন অধিকার রাখবে?
যৌনকর্মীরা কি কোনো দিন নতুন জীবন শুরু করতে পারবেন? পারবেন—অনেকের জন্য সেই সম্ভাবনা বাস্তব হতে পারে। কিন্তু তার জন্য ব্যক্তিগত ইচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক সুযোগ, নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পেশা পরিবর্তনের সুযোগকে যেন সামাজিক অপমানের আরেকটি শর্তে পরিণত করা না হয়। একজন নারী পেশা ছাড়তে চাইলে তাঁর সামনে বাস্তব বিকল্প থাকতে হবে। আর তিনি পেশায় থাকলেও তাঁর নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদাকে অস্বীকার করা যাবে না।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন থাকবে—বিকল্প জীবিকার নীতি কতটা কার্যকর? সমাজের কাছে প্রশ্ন থাকবে—অতীতের পরিচয়ের কারণে মানুষকে কত দিন বর্জন করা হবে? ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রশ্ন থাকবে—নৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব সহায়তার পথ কতটা উন্মুক্ত? আর গণমাধ্যমের কাছে প্রশ্ন থাকবে—পুনর্বাসনের গল্পের পাশাপাশি তার সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রমাণ কতটা অনুসন্ধান করা হচ্ছে?
ইসলাম যেসব উপার্জনকে হারাম ঘোষণা করেছে, সেসব থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পেশার সঙ্গে জড়িত, তাদের ঘৃণা বা অবহেলা না করে ইসলামের পথে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে হবে।
তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, আর্থিক সহযোগিতা, সামাজিক পুনর্বাসন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিবাহের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত। শুধু নিষেধ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং হালাল উপার্জনের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
মানুষকে অপমান করা নয়, বরং তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। কারণ, স্থায়ী সমাধান শুধু নিন্দা বা বর্জনের মধ্যে নয়; বরং সংশোধন, সহমর্মিতা, পুনর্বাসন ও সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন করার, অন্যকে সৎপথে আহ্বান করার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন।
কোনো নারীকে নতুন জীবন শুরু করার অধিকার পেতে হলে আগে সমাজের অনুমোদন অর্জন করতে হবে—এমন ব্যবস্থা মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত কাউকে জোর করে একটি নির্দিষ্ট পথে চালিত করা নয়; বরং তাঁর সামনে এমন বাস্তব সুযোগ তৈরি করা, যাতে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাপদ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

অতীতকে মুছে ফেলা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু অতীতের কারণে ভবিষ্যতের প্রতিটি দরজা বন্ধ থাকবে—এমন নিয়তি কোনো মানুষের জন্য নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright © Frilix Group
Theme Customized By BreakingNews