সাংবাদিক মোঃ আঃ কুদ্দুস (মানবাধিকার কর্মী )
বিএ অনার্স (বাংলা) এম.এ;
সৎ মানুষের রাজনীতিতে সংকট, দুর্নীতিবাজদের উত্থান—৫৫ বছরের ইতিহাস কী বলে?
‘সমাজের নিকৃষ্ট ব্যক্তিরা সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হন, আর সবচেয়ে দুর্নীতিবাজরা নেতৃত্বে চলে আসেন’—জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের এমন মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও নেতৃত্বের গুণগত মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২১ অক্টোবর ভোলার তজুমদ্দিনে বিএনপির এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সৎ মানুষের রাজনীতি করার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
স্পিকারের বক্তব্যে রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এলেও প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের অধিকাংশই কি সত্যিই অসৎ ও দুর্নীতিবাজ? নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির ঘাটতি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে।
১৯৭১ থেকে ১৯৭৫: স্বাধীনতার স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাত
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, খাদ্যসংকট, কালোবাজারি ও দুর্নীতির অভিযোগ রাষ্ট্র পরিচালনাকে কঠিন করে তোলে।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং একই বছরের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
তবে এই সময়ের সব জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতাকে অসৎ বলা ইতিহাসসম্মত নয়। স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া, রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখা এবং জনসেবায় অবদান রাখা বহু মানুষের উপস্থিতিও ইতিহাসের অংশ।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯০: সামরিক শাসন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন রূপ নেয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলেও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
এই সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগও আলোচিত হয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। ইতিহাসের বিচার করতে হলে এসবের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
১৯৯১ থেকে ২০০৬: সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরল, কিন্তু দুর্নীতির প্রশ্ন রইল
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। নির্বাচনী প্রতিযোগিতা, সংসদীয় রাজনীতি এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তও তৈরি হয়।
কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত, সংসদ বর্জন, দলীয়করণ, নিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতিবিষয়ক সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ তলানির দেশগুলোর মধ্যে ছিল। যদিও এ সূচক মূলত দুর্নীতি সম্পর্কে ধারণা ও মূল্যায়ন পরিমাপ করে, এটি দিয়ে কোনো দেশের সব রাজনীতিককে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করা যায় না।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়—দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত সরকারগুলো কেন দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি?
২০০৭ থেকে ২০০৮: দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।
এ সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এলেও আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান তখনই কার্যকর হবে, যখন তা হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং আইনের অধীন। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচারই হওয়া উচিত মূলনীতি।
২০০৯ থেকে ২০২৪: উন্নয়ন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ
২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
তবে উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, ঋণখেলাপি, সরকারি প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থ পাচার এবং ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতির অভিযোগও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওই সময়ের রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।
তবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সমালোচনা করলেই বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অতীত ও বর্তমানের দুর্নীতির প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না। একইভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রত্যেক নেতা বা জনপ্রতিনিধিকে অপরাধী বলাও ন্যায়সংগত নয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার যে দলের আমলেই হোক, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৪ থেকে ২০২৬: পরিবর্তনের প্রত্যাশা, জবাবদিহির পরীক্ষা
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন, দুর্নীতির বিচার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সংসদ গঠিত হয় এবং বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
কিন্তু সরকার পরিবর্তন মানেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন নয়। নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে—তারা কি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসন পরিচালনা করবে? দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবে? নাকি পুরোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি নতুন ব্যক্তিদের মাধ্যমে আবারও ফিরে আসবে?
যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এসব বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সংকট কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনব্যবস্থা ও জবাবদিহির কাঠামোও জড়িত।
তাহলে স্পিকারের বক্তব্য কতটা সত্য?
স্পিকারের বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে প্রশ্ন উঠবে—সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের মধ্যে কতজনকে ‘নিকৃষ্ট’ বা ‘সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে?
এমন কোনো সর্বজনীন পরিসংখ্যান নেই, যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীকে এভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। ফলে তাঁর বক্তব্যকে প্রমাণিত সামগ্রিক সত্য না বলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে একটি কঠোর মূল্যায়ন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।
তবে তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি অমূলক নয়। রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব, পেশিশক্তি, দলীয় আনুগত্য, মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ এবং নির্বাচনী ব্যয়ের চাপ সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যখন একজন প্রার্থীকে জনগণের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে বিপুল অর্থ ব্যয়, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন কিংবা দলীয় ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য—জনসেবা—পেছনে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
কিন্তু এই পরিস্থিতির দায় শুধু রাজনীতিকদের নয়। দুর্বল নির্বাচনব্যবস্থা, অকার্যকর নজরদারি, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশাসনিক দলীয়করণ এবং রাজনৈতিক অপরাধের বিচারহীনতাও সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
সৎ মানুষ কি রাজনীতিতে নেই?
বাংলাদেশের ইতিহাসে সৎ, সাহসী ও জনকল্যাণে নিবেদিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অভাব নেই। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী, স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি এবং জনসেবায় নিয়োজিত বহু মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করেছেন।
একইভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোনো দলের পরিচয় কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৎ বা অসৎ প্রমাণ করে না।
সমস্যা হচ্ছে, সৎ মানুষের রাজনীতিতে প্রবেশ এবং টিকে থাকার পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি যোগ্যতা, সততা ও জনসম্পৃক্ততার পরিবর্তে অর্থ, প্রভাব ও আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে নেতৃত্বের মান উন্নত হবে কীভাবে?
উত্তরণের পথ কোথায়?
বাংলাদেশে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ এবং সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা, প্রার্থীদের অর্থের উৎস যাচাই এবং মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় সততা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং গণমাধ্যমকে দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, সংসদকে কার্যকর করতে হবে, বিরোধী দলের মত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে এবং জনপ্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।
শেষ কথা
১৯৭১ থেকে ২০২৬—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার বদলেছে, শাসক বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির সংকটের প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে।
তাই ‘সবচেয়ে দুর্নীতিবাজরাই নেতৃত্বে আসেন’—এমন সর্বজনীন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালীরা বারবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পান? কেন সৎ, যোগ্য ও জনবান্ধব নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না?
জাতীয় সংসদের স্পিকারের বক্তব্য যদি সত্যিই রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান হয়ে থাকে, তাহলে সেই আহ্বান শুধু অতীতের শাসকদের জন্য নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব রাজনৈতিক দলের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি সবার নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায়—কে কতটা স্বচ্ছ, কে কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কে সত্যিকার অর্থে জনগণের কল্যাণে কাজ করছেন।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট: শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে সুশাসন আসে না; সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে।