মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫২ অপরাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ :
“শবনম ভেজা ইয়াদ” মোহনপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ, থানায় মামলা দায়ের; ভান্ডারিয়ায় মৎস্য অভিযানে একজনের ১০ হাজার টাকা জরিমানা, ১৫ দিনের কারাদণ্ড; বাংলাদেশ বাউল সমিতি শেরপুর জেলা কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক হলেন বাউল শিল্পী সিনথিয়া খান; রামুর বাকখালী নদীতে জাহাজ ভাসা উৎসব; বেলকুচিতে “সুন্দর সমাজ গড়ার” অঙ্গীকার নিয়ে আবু মুসা বাবুলের উঠান বৈঠক; সিরাজগঞ্জ মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনে উড়োজাহাজ মার্কায় আসলামের গণসংযোগ; টঙ্গীতে কালবেলার সাংবাদিককে অপহরণ-নির্যাতন: বিএসকেপির নিন্দা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি; নওগাঁয় মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবা-গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৩; আত্রাইয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে১৫টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ; ৮১ বছরে জাতিসংঘ: মানবতার কল্যাণে কার্যকর জাতিসংঘ চাই; ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুলকে ঘিরে ‘তথ্য সন্ত্রাস! একটি বিড়াল, একটুখানি মায়া ও অমলিন ভালোবাসা; চিকিৎসাসেবা: সেবার পরিবর্তে ব্যবসা; রাজাপুরে গণঅধিকার পরিষদ এর উপজেলা কমিটির সভাপতি নাসির উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মনির; এনায়েতপুরে ক্লিনিকের চিকিৎসাবর্জ্য রাস্তার পাশে, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এলাকাবাসী; *রাজশাহী রেঞ্জের নবযোগদানকৃত স্টাফ অফিসারকে স্বাগত জানালেন ডিআইজি; মোংলা কাস্টমসের কর্মকর্তা মামুনের অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন; কাউখালীতে সন্ধ্যা নদীতে মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযান; নওগাঁর রাণীনগরে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩;

একটি বিড়াল, একটুখানি মায়া ও অমলিন ভালোবাসা;

  • Update Time : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১১ বার পঠিত




মাসুদ রানা,কুমিল্লা ;

আমি একা থাকি চারতলায়, রাতে আসি, সকালে চলে যাই—এই ভবনে আমার আপন বলতে যেন একটি বিড়ালই আছে!
লিখতে ইচ্ছা হলো। মনটা আজ একটু খারাপ।
মানুষের জীবন বড় বিচিত্র। জীবনের পথে কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, কত সম্পর্ক তৈরি হয়, আবার কত সম্পর্ক সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। অথচ কখনো কখনো কোনো কথা ছাড়াই, কোনো পরিচয় ছাড়াই, একটি ছোট্ট প্রাণী হৃদয়ের এমন একটি জায়গা দখল করে নেয়, যেখানে অনেক পরিচিত মানুষও পৌঁছাতে পারে না।
আজ তেমনই একটি অনুভূতির কথা লিখতে বসেছি। ঘটনাটি খুব সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে এর আবেগ অনেক গভীর। এই গল্পের কেন্দ্রে কোনো মানুষ নেই, নেই স্বার্থের হিসাব কিংবা পাওয়া-না-পাওয়ার সমীকরণ। আছে একটি অবলা প্রাণী—একটি বিড়াল। আর আছে আমার একাকী জীবনের কিছু নীরব অনুভূতি, একটুখানি মায়া ও অমলিন ভালোবাসা।

আমি দেবিদ্বারে একটি ভবনের চতুর্থ তলায় একা থাকি। রাতে কক্ষে আসি, সকালে আবার চলে যাই। আমার প্রতিদিনের জীবনটা অনেকটাই এমন। এই ভবনে আসা-যাওয়ার পথে মানুষের সঙ্গে খুব একটা দেখা হয় না। নিজের মতো করে থাকি, নিজের কাজ করি, আবার প্রয়োজন শেষে চলে যাই।
কিন্তু এই নির্জন জীবনে একটি ছোট্ট প্রাণীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তার কোনো নাম নেই আমার কাছে, সে আমার ভাষায় কথা বলতে পারে না। তবু কেন জানি মনে হয়, এই ভবনে আমার আপন বলতে যেন সেই বিড়ালটিই আছে।
প্রায় ছয় মাস আগের কথা। একদিন সিঁড়িতে একটি বিড়াল দেখতে পেলাম। প্রথমে তাকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। পাশ কাটিয়ে নিজের কক্ষে চলে এলাম। তখনো বুঝতে পারিনি, এই ছোট্ট প্রাণীটি একদিন আমার মনে এতটা মায়া তৈরি করবে।
আমার কক্ষের সামনে বেশ বড় একটি খালি জায়গা রয়েছে। সেদিন লক্ষ করলাম, আমার কক্ষের দরজা খোলা। বিড়ালটি ধীরে ধীরে হেঁটে এসে দরজার সামনে বসে পড়ল। তার দিকে তাকাতেই কেমন যেন মায়া লাগল। মনে হলো, হয়তো ক্ষুধার্ত, হয়তো একটু খাবার কিংবা আশ্রয় খুঁজছে।
আমার কাছে কিছু খাবার ছিল। তাকে খেতে দিলাম। সে খাওয়াদাওয়া করে আমার দরজার সামনে শুয়ে রইল। আর আমি নিজের কক্ষে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘটনাটি খুবই সাধারণ। প্রতিদিন কত মানুষ কত প্রাণীকে খাবার দেয়, আশ্রয় দেয়, আদর করে। কিন্তু জীবনের কিছু সাধারণ ঘটনাই কখনো কখনো হৃদয়ে অসাধারণ অনুভূতির জন্ম দেয়।
এরপর থেকে রাতে যখনই বিড়ালটির সঙ্গে দেখা হতো, আমি তাকে কিছু না কিছু খেতে দিতাম। সে খাবার খেত, কখনো দরজার সামনে বসে থাকত, কখনো শুয়ে থাকত। তার সঙ্গে আমার কোনো কথোপকথন ছিল না। সে আমার ভাষা বোঝে কি না, জানি না। আমিও তার মনের কথা বুঝতে পারি না। তবু তার উপস্থিতি আমার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
আমি সব সময় সেখানে থাকি না। মাঝেমধ্যে দেবিদ্বারে আসি, রাতে নিজের কক্ষে থাকি, সকালে আবার চলে যাই। যখন আসতাম, তখনই বিড়ালটির সঙ্গে দেখা হতো। তাকে কিছু খেতে দিতাম। কিন্তু আমার অনুপস্থিতিতে সে কোথায় থাকত, কে তাকে খাবার দিত, কীভাবে তার দিন কাটত—এসব কিছুই আমার জানা ছিল না।
এভাবেই অজান্তে তার প্রতি একধরনের মায়া তৈরি হয়ে গেল। তাকে খাবার দেওয়ার বিনিময়ে আমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। শুধু মনে হতো, ছোট্ট প্রাণীটি ক্ষুধার্ত হলে একটু খাবার পাবে, আর আমার সামনে এলে অন্তত তাড়িয়ে দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না।
অনেক দিন দেবিদ্বারে আসা হয়নি। গত শনিবার সেখানে এলাম। স্বাভাবিকভাবেই চোখ গেল সেই পরিচিত জায়গাটির দিকে। মনে মনে ভাবছিলাম, বিড়ালটি হয়তো আশপাশেই আছে। কিন্তু তাকে দেখতে পেলাম না।
মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম, হয়তো সে তার আগের কোনো গন্তব্যে চলে গেছে। হয়তো অন্য কোথাও আশ্রয় পেয়েছে, হয়তো কেউ তাকে খাবার দিচ্ছে। আবার মনে হলো, এমনও তো হতে পারে, সে আর কখনো এখানে আসবে না।
নিজেকে বোঝালাম, একটি বিড়ালকে নিয়ে এত ভাবার কী আছে! সে তো স্বাধীন প্রাণী। যেখানে ভালো থাকবে, সেখানেই থাকবে। কিন্তু মনের মধ্যে যে একটু মায়া জন্মেছিল, সেটি কি আর এত সহজে দূর করা যায়?
তার সঙ্গে আমার কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। তাকে কোনো নাম ধরে ডাকি না, সে আমার সঙ্গে কথা বলে না। তবু পরিচিত সেই জায়গায় তাকে দেখতে না পেয়ে মনে হলো, যেন প্রতিদিনের পরিচিত ছোট্ট একটি দৃশ্য হারিয়ে গেছে।

রবিবার রাত তখন প্রায় ১১টা। হঠাৎ সেই বিড়ালটিকে আবার দেখতে পেলাম।
সে শুয়ে ছিল। আমাকে দেখেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
তার চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারিনি। হয়তো সে ক্ষুধার্ত ছিল, হয়তো ক্লান্ত ছিল, কিংবা হয়তো নিছকই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু আমার মনে হলো, সে যেন আমার কাছ থেকে কিছু চাইছে।
দুর্ভাগ্যবশত, তখন আমার সঙ্গে কোনো খাবার ছিল না। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, এখন কি নিচে গিয়ে তার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসব?
ঠিক তখনই আমার এক ভাড়াটিয়ার ছেলে এসে বলল, ‘আঙ্কেল, বিড়ালটা কয়েকদিন আগে ছাদে দেখতে পাই আমাদের বাসায় নিয়ে গেছি । আমরা ওকে খাওয়াদাওয়া দিতাম। কিন্তু গতকাল দুপুরে ও ছাদে উঠে আর নিচে নামছে না। কেন এমন করছে, বুঝতে পারছি না। ওকে দুইবার বাসায় নিয়ে এসেছি। কিন্তু দরজা খোলা পেলেই আবার ছাদে চলে যায়।’
তার কথা শুনে আমি ভাবতে লাগলাম, বিড়ালটি হঠাৎ ছাদে গিয়ে থাকছে কেন? কী এমন হয়েছে যে সে সেখানে বারবার চলে যাচ্ছে?
ভাবতে ভাবতে মনে হলো, ছাদে আমার গামছা ও লুঙ্গি শুকাতে দেওয়া ছিল। সেগুলোর পরিচিত গন্ধ পেয়ে কি সে সেখানে গিয়েছে? আমার উপস্থিতির কোনো পরিচিত চিহ্ন কি তাকে আকৃষ্ট করেছে?
এটি নিছকই আমার অনুমান। বিড়ালটি কেন ছাদে যাচ্ছিল, তার প্রকৃত কারণ আমি জানি না। হয়তো অন্য কোনো কারণ ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে একটি কথাই ঘুরছিল—একটি ছোট্ট প্রাণীর প্রতিও মানুষের মায়া জন্মাতে পারে, আবার সেই প্রাণীটিও পরিচিত পরিবেশ ও মানুষের সান্নিধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে।
আমরা মানুষও তো এমনই। প্রিয় মানুষের ব্যবহৃত কোনো পোশাক, পরিচিত কোনো গন্ধ কিংবা ফেলে যাওয়া কোনো স্মৃতি হঠাৎ সামনে এলে বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। মনে হয়, মানুষটি যেন খুব কাছে আছে। অথচ বাস্তবে সে হয়তো অনেক দূরে।
বিড়ালটির আচরণে আমি কী দেখেছি, তা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো প্রমাণ আমার কাছে নেই। কিন্তু আমার হৃদয়ে যে অনুভূতির জন্ম হয়েছে, সেটি একান্তই আমার নিজের।আমার মৃত্যুর খবর কি সবার আগে জানবে এই বিড়াল?
জীবনের কিছু কথা আছে, যা মানুষ সহজে কাউকে বলতে পারে না। একা থাকতে থাকতে কখনো কখনো নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ এবং মৃত্যুর কথাও মনে আসে।
আমি এই ভবনের চারতলায় একা থাকি। রাতে কক্ষে আসি, সকালে চলে যাই। এই ভবনে সবার সঙ্গে আমার নিয়মিত দেখা হয় না। নিজের মতো করে থাকি। আমার জীবনের প্রতিদিনের এই ছোট্ট বাস্তবতার মধ্যে বিড়ালটির সঙ্গে গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত সম্পর্ক।
কখনো কখনো মনে হয়, মানুষের জীবন তো অনিশ্চিত। কে কখন কোথায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করবে, তা কেউ জানে না। আমার মৃত্যুও কোথায় লেখা আছে, তা আমার জানা নেই।
যদি কোনো দিন এই কক্ষেই আমার মৃত্যু হয়, আর আমি যদি দীর্ঘ সময় কারও নজরে না আসি, তাহলে হয়তো আমার দরজার সামনে ঘোরাফেরা করা এই বিড়ালটিই প্রথম আমার অনুপস্থিতি অনুভব করবে। হয়তো সে দরজার সামনে বসে থাকবে, হয়তো পরিচিত মানুষটির দেখা না পেয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। পরে হয়তো অন্যরা জানতে পারবেন।
এটি কেবল আমার মনের একটি ভাবনা। বাস্তবে কী ঘটবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু এমন ভাবনা মনে এলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে।
তখন নিজের অজান্তেই মনে হয়, বিড়াল, তুই কি আমার আপন একটি প্রাণী হয়ে উঠেছিস?
কথাটা শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগতে পারে। একটি মানুষ আর একটি বিড়ালের সম্পর্ক নিয়ে এত কথা কেন? কিন্তু যারা একা থাকেন, তারাই হয়তো বুঝতে পারবেন, নীরব সঙ্গ কখনো কখনো কতটা মূল্যবান হয়ে ওঠে।
সব সময় মানুষের ভিড়ের মধ্যে থাকলেই যে একাকিত্ব দূর হয়, তা নয়। আবার কোনো কথা না বলা একটি প্রাণীর উপস্থিতিও কখনো কখনো নিঃসঙ্গ জীবনে একটুখানি আনন্দ এনে দিতে পারে।
বিড়ালটি আমার জীবনের সব সমস্যার সমাধান করে দেয়নি। আমার সঙ্গে তার কোনো কথাও হয় না। কিন্তু রাতে কক্ষে ফিরে পরিচিত সেই প্রাণীটিকে দেখতে পাওয়া, তাকে একটু খাবার দেওয়া কিংবা দরজার সামনে শুয়ে থাকতে দেখা—এই সামান্য ঘটনাগুলোই আমার কাছে একধরনের ভালো লাগার কারণ হয়ে উঠেছে।
মানুষের জীবনে সব সম্পর্কের নাম থাকে না। কিছু সম্পর্ক শুধু অনুভবের। আমার কাছে এই বিড়ালটির সঙ্গে সম্পর্কটিও তেমন।

ভাবতে লাগলাম, আমি তো তাকে খুব বেশি সময় দিইনি। তাকে নিয়ে কোনো বড় পরিকল্পনাও করিনি। যখন দেখা হয়েছে, তখন সামান্য খাবার দিয়েছি, একটু আদর করেছি। অথচ সেই ছোট্ট প্রাণীটিকে ঘিরে আমার মনে এত অনুভূতি তৈরি হলো কেন?
হয়তো ভালোবাসার জন্য অনেক কিছু লাগে না। লাগে না বড় কোনো আয়োজন, দামি উপহার কিংবা মুখে মুখে ভালোবাসার কথা বলা। কখনো কখনো একমুঠো খাবার, একটু নিরাপদ আশ্রয় আর মমতাভরা দৃষ্টিই যথেষ্ট।
আমি বিড়ালটিকে আদর করলাম। তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে চাইলাম, সে যেন নিরাপদে থাকে, ভালো থাকে, কেউ যেন তাকে কষ্ট না দেয়।
এরপর ছেলেটিকে বললাম, ‘সকালে ওকে তোমাদের বাসায় নিয়ে যেয়ো। তোমরাই ওর দেখাশোনা করবে। আমি যখন আসব, তখন ওকে বাইরে ছেড়ে দিয়ে দরজাটা খুলে দিয়ো।’
আমার কথার মধ্যে কোনো দাবি ছিল না। বিড়ালটিকে নিজের করে রাখার আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। শুধু চেয়েছিলাম, সে যেন নিরাপদে থাকে, খাবার পায় এবং কেউ যেন তাকে অবহেলা না করে।
ভালোবাসা মানে সব সময় কাউকে নিজের কাছে আটকে রাখা নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে তার জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, তার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।অবশেষে বিড়ালটির খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো
সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, আমার ভবনের লোকজনও বিড়ালটির প্রতি মমতা দেখিয়েছেন। তারা তাকে খাবার দিয়েছেন, নিজেদের বাসায় আশ্রয় দিয়েছেন এবং তার দেখাশোনা করার চেষ্টা করছেন।
এতে আমার মন কিছুটা শান্ত হয়েছে। অন্তত বিড়ালটি একেবারে অসহায় অবস্থায় নেই। তার খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে, থাকার জন্য একটি আশ্রয়ও রয়েছে।
আমি সব সময় এখানে থাকি না। রাতে আসি, সকালে চলে যাই। তাই আমার পক্ষে প্রতিদিন তার দেখাশোনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু অন্যরা যদি তাকে খাবার দেন, আশ্রয় দেন এবং যত্ন করেন, তাহলে সেটিই হবে আমার জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
আমি চাই, বিড়ালটি ভালো থাকুক। আমার সঙ্গে তার পরিচয় থাকুক কিংবা না থাকুক, সে যেন নিরাপদে বেঁচে থাকে।
হয়তো আমার অনুপস্থিতিতেও সে পরিচিত সেই দরজার সামনে এসে বসবে। হয়তো কোনো এক রাতে আমি ফিরে এসে তাকে আবার দেখতে পাব। তখন হয়তো তাকে একটু আদর করব, কিছু খাবার দেব। আমাদের এই নীরব সম্পর্ক আবারও নতুন করে অনুভব করব।
ভালোবাসা সব সময় ভাষায় প্রকাশ পায় না
আমরা প্রায়ই ভাবি, ভালোবাসা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রাণীদের প্রতিও মানুষের গভীর মমত্ববোধ জন্মাতে পারে। অনেক প্রাণী পরিচিত পরিবেশে স্বস্তি বোধ করে, মানুষের স্নেহ ও যত্নের প্রতি সাড়া দেয়। তাদের আচরণের প্রতিটি কারণ আমরা বুঝতে না পারলেও তাদের প্রতি সদয় হওয়া আমাদের দায়িত্ব।
একটি ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া, তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি দেওয়া কিংবা অসহায় কোনো প্রাণীকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া—এসব কাজের জন্য বড়লোক হতে হয় না, বিখ্যাত হতে হয় না। শুধু একটি কোমল হৃদয় থাকলেই চলে।
আমরা যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ ও প্রাণীর প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হই, তাহলে পৃথিবীটা আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
জীবনে কত মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। কেউ আসে, কেউ চলে যায়। কেউ পাশে থাকে দীর্ঘদিন, কেউ আবার অল্প সময়ের মধ্যেই স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় নেই। তবু সেগুলো হৃদয়ের গভীরে থেকে যায়।
আমার কাছে এই বিড়ালটির সঙ্গে সম্পর্কটিও তেমনই। তার সঙ্গে আমার কোনো স্বার্থের সম্পর্ক নেই। নেই কোনো প্রত্যাশা। আছে শুধু সামান্য খাবার দেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া মায়া, পরিচিত একটি প্রাণীকে দেখার অপেক্ষা এবং তাকে ভালো রাখার একটুখানি ইচ্ছা।

আমি জানি না, ভবিষ্যতে এই বিড়ালটির সঙ্গে আমার আর কত দিন দেখা হবে। হয়তো কোনো দিন সে আর আসবে না। হয়তো একদিন দেবিদ্বারে এসে দেখব, পরিচিত সেই জায়গাটিতে সে নেই। জীবন তো এমনই—কত পরিচিত দৃশ্য, কত মানুষ, কত প্রাণী একসময় আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়।

আমি একা থাকি চারতলায়। রাতে কক্ষে আসি, সকালে চলে যাই। এই ভবনে সবার সঙ্গে আমার দেখা হয় না। অথচ একটি বিড়ালের সঙ্গে আমার দেখা হয়, তৈরি হয়েছে একটুখানি মায়া।
কখনো কখনো মনে হয়, এই ছোট্ট প্রাণীটি আমার একাকী জীবনের নীরব সঙ্গী। হয়তো সে জানে না, তার উপস্থিতি আমার মনে কতটা ভালো লাগা তৈরি করেছে। হয়তো সে বোঝেও না, তাকে না দেখলে আমার মন খারাপ হয়। কিন্তু তার প্রতি আমার যে মমতা জন্মেছে, তা আমার কাছে সত্য।
জীবনের শেষ মুহূর্তে মানুষ হয়তো তার সম্পদের হিসাব মনে রাখবে না, মনে রাখবে না কে কত বড় পদে ছিল কিংবা কত পরিচিত ছিল। কিন্তু কারও প্রতি করা সামান্য ভালোবাসা, বিপদের সময় বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত কিংবা অসহায় প্রাণীকে দেওয়া একমুঠো খাবারের স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে থেকে যেতে পারে।
আমি জানি না, আমার জীবনের শেষ ঠিকানা কোথায়। সেই দিন কখন আসবে, তাও জানি না। তবে যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন মানুষের পাশাপাশি এই অবলা প্রাণীগুলোর প্রতিও মমতা নিয়ে বাঁচতে চাই।
বিড়াল, তুই ভালো থাকিস। তোর খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে, থাকার জন্য আশ্রয়ও হয়েছে—এটাই আমার কাছে অনেক বড় স্বস্তি।
হয়তো তোর সঙ্গে আমার সম্পর্কের কোনো নাম নেই। তুই আমার ভাষায় কথা বলতে পারিস না, আমিও তোর মনের কথা বুঝতে পারি না। তবু তোর প্রতি আমার এই মায়া থেকে যাবে।
কারণ, ভালোবাসা সব সময় বড় কোনো গল্প তৈরি করে না। কখনো কখনো একটি ছোট্ট প্রাণী, একমুঠো খাবার, একটি খোলা দরজা আর রাত ১১টার একটি নীরব দৃষ্টিই মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকার মতো একটি গল্প লিখে দেয়।জীবনের পথে কত সম্পর্কই তো তৈরি হয়, কত সম্পর্কই হারিয়ে যায়। কিন্তু হৃদয় থেকে জন্ম নেওয়া মায়া কখনো কখনো সময়ের সীমানা পেরিয়ে স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।
হয়তো এই ছোট্ট বিড়ালটির সঙ্গে আমার সম্পর্কও তেমনই—নামহীন, নীরব, অথচ আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকার মতো এক টুকরো ভালোবাসা।
— মোঃ মাসুদ রানা

সংবাদটি শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright © Frilix Group
Theme Customized By BreakingNews