ফেরেশতার মুখ, শয়তানের মন
মোঃ আঃ কুদ্দুস (বি.এ. অনার্স, এম.এ. বাংলা)
“ফেরেশতার মতো মুখ, অথচ শয়তানের মতো মন”—এ যেন আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মুখে মধু, অন্তরে বিষ; পোশাকে পবিত্রতা, অথচ কর্মে কলুষতা—এমন দ্বৈত চরিত্রের মানুষ সমাজের জন্য নীরব বিপদ।
এই প্রবণতা কোনো একটি পেশা বা শ্রেণির একচেটিয়া বিষয় নয়। অসাধু উকিল যদি ন্যায়কে পাশ কাটিয়ে সত্যকে আড়াল করেন, অসৎ সাংবাদিক যদি সত্যের কলমকে স্বার্থের কাছে সমর্পণ করেন, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা যদি জনগণের আমানতকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেন, ভণ্ড ধর্মীয় নেতা যদি ধর্মের পবিত্রতাকে নিজের স্বার্থের ঢাল বানান—তবে প্রত্যেকেই বিশ্বাসের জায়গাকে দুর্বল করেন।
একইভাবে, কোনো বিচারক যদি ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন, কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনৈতিক সুবিধাকে প্রশ্রয় দেন, তবে ক্ষতি শুধু একজন মানুষের হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের আস্থা।
তবে মনে রাখতে হবে—উকিল, সাংবাদিক, বিচারক, রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা বা প্রশাসনের সবাই এমন নন। বরং যারা নিজ নিজ পেশার নৈতিক দায়িত্ব বিসর্জন দেন, তাদের আচরণই নিন্দনীয়। কারণ একজন উকিলের কাছে মানুষ ন্যায় আশা করে, সাংবাদিকের কাছে সত্য, বিচারকের কাছে নিরপেক্ষ বিচার, নেতার কাছে জনসেবা, ধর্মীয় নেতার কাছে নৈতিক পথনির্দেশ এবং প্রশাসনের কাছে সুশাসন।
তাদের বিশ্বাসভঙ্গ তাই সাধারণ প্রতারণার চেয়েও ভয়ংকর। কারণ তারা শুধু মানুষকে ঠকায় না—তারা মানুষের বিশ্বাসের ভিতেও ফাটল ধরায়।
অন্যায় যতই মুখোশ পরুক, সত্যকে চিরদিন বন্দি রাখা যায় না। মিথ্যার প্রাসাদ যত উঁচুই হোক, সত্যের এক ঝড়েই তার দেয়াল কেঁপে ওঠে। অনৈতিকতার শেষ পরিণতি হতে পারে বিশ্বাস হারানো, সম্মান হারানো, সম্পর্ক হারানো এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া।
তাই প্রয়োজন কোনো পেশাকে হেয় করা নয়; বরং প্রতিটি পেশার মর্যাদা ও নৈতিকতা রক্ষা করা। আইনজীবী হবেন ন্যায়ের সহযাত্রী, সাংবাদিক সত্যের প্রহরী, বিচারক ন্যায়বিচারের প্রতীক, রাজনৈতিক নেতা জনগণের সেবক, ধর্মীয় নেতা নৈতিকতার পথপ্রদর্শক এবং প্রশাসন হবে জনগণের সেবার প্রতিষ্ঠান—এটাই একটি সুস্থ রাষ্ট্রের প্রত্যাশা।
মুখের সৌন্দর্য ক্ষণিকের,
চরিত্রের সৌন্দর্য চিরদিনের।
মুখোশ মানুষকে মুগ্ধ করে,
কর্মই মানুষকে ইতিহাসে বাঁচিয়ে রাখে।
শেষ কথা—জাতির পতন শুধু দুর্নীতিতে হয় না; ন্যায়, সত্য ও বিবেক যখন নীরব হয়ে যায়, তখনই পতনের ঘণ্টা বাজে। তাই মুখ নয়, পরিচয় নয়, পদ নয়—মানুষকে বিচার করতে হবে তার কর্ম, সততা ও চরিত্র দিয়ে।