
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকের শত্রু সাংবাদিক;
:বিশেষ প্রতিবেদন ;
সাংবাদিকতা ছিল মানুষের কথা বলার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং সত্যকে সমাজের সামনে তুলে ধরার একটি মহান পেশা। একজন সাংবাদিকের কলমের শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের আশার প্রতীক। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা শত্রু হয়ে উঠছেন আরেকজন সাংবাদিক।
একজন সাংবাদিক যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করেন, তখন অন্য একজন সাংবাদিকের উচিত তাকে সহযোগিতা করা, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনে আরও তথ্য যোগ করে সংবাদটিকে সমৃদ্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, কে আগে সংবাদ প্রকাশ করবেন, কার সংবাদ বেশি ভাইরাল হবে, কে বেশি পরিচিতি পাবেন কিংবা কে প্রশাসনের কাছে বেশি গুরুত্ব পাবেন—এসব নিয়ে শুরু হয় অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
কখনো একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আরেকজন সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালান। কখনো তার সংবাদকে হেয় করা হয়, কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়। এমনকি কোনো সাংবাদিক পেশাগতভাবে ভালো করলে তাকে উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে তার ভুল খুঁজে বের করে নিচে নামানোর চেষ্টা করা হয়।
এই প্রবণতা শুধু একজন সাংবাদিকের ক্ষতি করে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সাংবাদিকতা পেশা। কারণ সাংবাদিকদের মধ্যে যখন পারস্পরিক আস্থা ও ঐক্য থাকে না, তখন অন্যায়কারী ও দুর্নীতিবাজরা সুযোগ পায়। সত্য প্রকাশের পথ দুর্বল হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থাও কমে যায়।
তবে প্রতিযোগিতা থাকা খারাপ নয়। বরং সুস্থ প্রতিযোগিতা সাংবাদিকতার মান বাড়ায়। সমস্যা তখনই, যখন প্রতিযোগিতা পেশাগত শত্রুতায় পরিণত হয়। একজন সাংবাদিকের সাফল্য অন্য সাংবাদিকের ব্যর্থতা নয়। বরং একজনের ভালো কাজ পুরো সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা বাড়ায়।
সাংবাদিকের কাজ সাংবাদিককে টেনে নামানো নয়; বরং ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, অন্যায় হলে পাশে দাঁড়ানো এবং সত্যের পক্ষে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়া।
আজ প্রয়োজন সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পেশাগত নৈতিকতা ও ঐক্য। কে আগে সংবাদ প্রকাশ করলেন—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবাদটি কতটা সত্য, নিরপেক্ষ ও জনস্বার্থসম্পন্ন।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিক সাংবাদিকের শত্রু নয়—সাংবাদিকতার শত্রু হলো মিথ্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্যায় ও অপসাংবাদিকতা।
যে সাংবাদিক অন্য সাংবাদিকের ভালো কাজকে সম্মান করতে শেখেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে পেশাটিকে সম্মান করেন। আর যে সাংবাদিক সহকর্মীকে নিচে নামিয়ে নিজেকে ওপরে তুলতে চান, তিনি হয়তো সাময়িকভাবে সফল হতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেন নিজের পেশা ও সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে।
তাই আসুন, সাংবাদিকের শত্রু সাংবাদিক নয়—সত্যের পক্ষে সাংবাদিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় সাংবাদিক—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।