
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; রাজনীতি হলো আদর্শের জন্য দীর্ঘ আত্মত্যাগ, জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে জনগণের অধিকার আদায়ের অবিরাম লড়াই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বিরোধী মতের ওপর যে দমনপীড়ন চালানো হয়েছে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ১০ নম্বর গুনাইঘর (দক্ষিণ) ইউনিয়ন বিএনপি। চরম দুঃসময়েও রাজপথ ছাড়েননি এই ইউনিটের সভাপতি, সাংবাদিক মো. মাসুদ রানা এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিয়া। শত মামলা, হামলা, পুলিশি হয়রানি ও হুলিয়া মাথায় নিয়ে তাঁরা টিকিয়ে রেখেছিলেন দলীয় অস্তিত্ব।
ভয়ার্ত রাত ও পুলিশের তাড়া: যে জীবনের নাম ছিল টিকে থাকার লড়াই
গত ১৫-১৬ বছর ধরে গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় সাংবাদিক মো. মাসুদ রানা এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিয়ার জীবন ছিল এক অবর্ণনীয় রোমহর্ষক অধ্যায়। আওয়ামী স্বৈরাচার সরকারের আমলে বিএনপি করার অপরাধে তাঁদের জীবনে নেমে এসেছিল বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। গায়েবি মামলার মারপ্যাঁচ, পুলিশি তল্লাশি আর দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর প্রতিদিনের হামলা-মামলার খড়্গ—সব মিলিয়ে তাঁদের নিজ ঘরে ঘুমানোর অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের ভয়ে রাতের পর রাত ঘরের বাইরে, ঝোপঝাড় কিংবা আত্মগোপনে কাটাতে হয়েছে। কিন্তু শত নির্যাতন, পরিবার-পরিজনের কান্না আর জীবননাশের প্রকাশ্য হুমকিও তাঁদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। দিনের পর দিন পালিয়ে বেড়ালেও যখনই সুযোগ এসেছে, তাঁরা রাজপথে নেমেছেন। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিছিল, পিকেটিং কিংবা দলীয় কর্মসূচি পালনে তাঁরা ছিলেন অগ্রগামী।
এই দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁদের ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মো. দুলাল সরকার, মো. হুমায়ুন, মুন্না মেম্বারসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতৃবৃন্দ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন যেমন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী এবং নিবেদিতপ্রাণ সাধারণ কর্মীরা। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাঁরা একসঙ্গে দলীয় কার্যক্রম টিকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁদের সকলের একটাই পণ ছিল—‘যেভাবেই হোক, এই ইউনিয়নকে বিএনপির একটি অজেয় দুর্গে পরিণত করব।’ সেই স্বপ্নের বীজ তাঁরা রোপণ করেছিলেন চরম বিপন্নতার মধ্য দিয়েই।
অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসের প্রতীক: সভাপতি ও সম্পাদকের অবদান
ইউনিয়নের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মুখে মুখে এখন সেই দুঃসময়ের সাহসী গল্প। তাঁরা জানান, যখন দলের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছিলেন কিংবা রাজনৈতিক চাপে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তখন সভাপতি সাংবাদিক মাসুদ রানা এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিয়া ছিলেন গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির বটবৃক্ষ। শত প্রলোভন ও হুমকির মুখেও তাঁরা দলের সঙ্গে বেইমানি করেননি।
সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে মাসুদ রানা যেমন সত্য প্রকাশে ছিলেন আপসহীন, তেমনি রাজনৈতিক ময়দানেও ছিলেন অকুতোভয়। অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিয়া ছিলেন প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের সম্মুখসারির যোদ্ধা। পুলিশের রিমান্ড, হামলা এবং কারাবাসের ভয় তাঁদের টলাতে পারেনি। নিজ ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে দলীয় নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত রাখতে তাঁরা ছিলেন সদা তৎপর।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তন ও নেতাকর্মীদের মনে বড় প্রশ্ন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটে। দেশজুড়ে বইছে মুক্তির হাওয়া। কারাবন্দি ও নির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মীরা ফিরে পেয়েছেন মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার অধিকার। ইউনিয়নের ঘরে ঘরে এখন আনন্দের জোয়ার। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও স্থানীয় নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এক গভীর প্রশ্ন—যাঁরা দলের দুঃসময়ে রক্ত ও শ্রম দিয়েছেন, মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর বাড়িছাড়া ছিলেন, দলের দুর্দিনেও যাঁরা তৃণমূলের হাল ধরে রেখেছিলেন, ৫ আগস্টের পর সেই ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন কি দল করবে?
ইউনিয়নের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের স্পষ্ট দাবি, হাইব্রিড বা সুযোগসন্ধানীরা যেন কোনোভাবেই নতুন পরিস্থিতিতে দলে অনুপ্রবেশ করে ছড়ি ঘোরাতে না পারে। দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার কারিগর মাসুদ রানা ও মোহাম্মদ জিয়ার মতো ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের কাঁধেই সংগঠনের পূর্ণ নেতৃত্ব এবং সঠিক মূল্যায়ন অর্পিত হওয়া উচিত।
আগামীর প্রত্যয়: দুর্গে পরিণত করার স্বপ্ন
সব প্রতিকূলতা আর না পাওয়ার বেদনাকে পাশ কাটিয়ে সভাপতি মো. মাসুদ রানা এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জিয়া এখনো স্বপ্ন দেখেন একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী বিএনপির। তাঁদের লড়াই কেবল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ছিল না, লড়াই ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার। সাংবাদিক মাসুদ রানা এবং মোহাম্মদ জিয়ার কণ্ঠে আজ একটাই প্রতিধ্বনি—‘স্বৈরাচারের আমলের জুলুম-অত্যাচার আমরা সহ্য করেছি কেবল দলের আদর্শকে ভালোবেসে। আমাদের রক্তে গড়া এই ইউনিয়নকে আমরা বিএনপির এমন এক দুর্গে রূপান্তর করব, যেখানে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার কখনো ম্লান হবে না।’
গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির এই নেতারাসহ দুর্দিনের লড়াকু সৈনিকদের আত্মত্যাগের গল্প শুধু একটি ইউনিটের ইতিহাস নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের নির্যাতিত তৃণমূল রাজনীতির এক অকৃত্রিম প্রতিচ্ছবি। সঠিক মূল্যায়ন আর ভালোবাসার মাধ্যমে এই ত্যাগী নেতাদের সম্মান জানানোই এখন দলের নৈতিক দায়িত্ব।