
মোঃ মাসুদ রানা;
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
৫ আগস্ট ২০২৪—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও আলোচিত দিন। টানা আন্দোলন, সংঘাত আর অনিশ্চয়তার পর সেদিন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসে নাটকীয় পরিবর্তন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন এবং দেশ ত্যাগ করেন। রাজধানীর ঘটনার রেশ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। কুমিল্লাও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
সকালের কুমিল্লা ছিল উৎকণ্ঠায় মোড়া। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি—সবখানেই মানুষের চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। সেনাপ্রধানের সম্ভাব্য ভাষণ নিয়ে চলছিল নানা আলোচনা। দুপুরের দিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো নগরীর চিত্র। কান্দিরপাড়, পূবালী চত্বর, জিলা স্কুল সড়ক, ধর্মসাগরপাড়সহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নেমে আসে হাজারো মানুষ। বিজয় মিছিল, স্লোগান, আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর। অনেকেই একে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন।
কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি দেখা দেয় আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। বিকেল গড়াতেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ক্লাব, ঐতিহাসিক কুমিল্লা টাউন হল, তৎকালীন সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের বাসভবনসহ কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। পুলিশ লাইনের বিভিন্ন স্থাপনা ও যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রামঘাট এলাকার দলীয় কার্যালয়সহ আরও কয়েকটি স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। একদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি—এই দুই বিপরীত দৃশ্যই সেদিন কুমিল্লার বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল।
এই দিনের পেছনে ছিল জুলাই মাসজুড়ে চলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল প্রেক্ষাপট। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ, মিছিল ও সংঘর্ষের মাধ্যমে কুমিল্লা জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে। ৩ আগস্ট কুমিল্লা পুলিশ লাইনের সামনে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ৪ আগস্ট বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের বিস্তার ঘটে এবং ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে।
আন্দোলনের দিনগুলোতে কুমিল্লার অনেক পরিবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হন ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মেঘ। তাঁর মা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার শীলা পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে সন্তানের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আজও অনেক পরিবারের মনে গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক অঙ্গনেও দ্রুত পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে। দেশের অন্যান্য জেলার মতো কুমিল্লাতেও প্রশাসনিক কার্যক্রম নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এক বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, ৫ আগস্ট ২০২৪ কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিন নয়; এটি ছিল উচ্ছ্বাস, ক্ষোভ, অস্থিরতা, আশা এবং অনিশ্চয়তার এক অনন্য মিশ্রণ। সেই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কুমিল্লার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মূল্যায়ন বদলাতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ৫ আগস্ট ২০২৪ কুমিল্লার জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।