বিশেষ প্রতিনিধি | মঠবাড়ীয়া, পিরোজপুর
মানবতা কি আজ ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব আর নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের কাছে হার মানছে? উৎসবের আয়োজনে যখন বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন অসহায় কোরআনের হাফেজ ও ইমামের জীবন বাঁচাতে মানুষের হাত কেন প্রসারিত হয় না? এই প্রশ্ন আজ বিবেকবান মানুষের সামনে।
পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির হোসেন। তাঁর পিতা জলিল ব্যাপারী। তিনি একজন কোরআনের হাফেজ ও ইমাম। বর্তমানে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন বলে তাঁর স্বজনদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অসচ্ছল পরিবারের এই মানুষটির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন আর্থিক সহযোগিতা ও মানবিক সহমর্মিতা।
পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু সেই আকুতি কতটা সাড়া পেয়েছে, তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন ধর্মীয় শিক্ষক ও ইমামের জীবন রক্ষায় সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসা কি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব নয়?
অন্যদিকে, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয়, শোভাযাত্রা, গাড়িবহর এবং নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থের ব্যবহার প্রায়ই চোখে পড়ে। শারদীয় দুর্গাপূজায় বিভিন্ন স্থানে উৎসবের আয়োজন হয়। সেখানে অনেকে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে অংশ নেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের উৎসবে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি অসহায় মানুষের দুঃখ-কষ্টের প্রতিও কি আমরা সমান গুরুত্ব দিচ্ছি? ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অর্থ ব্যয় করা ব্যক্তিগত ও সামাজিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে একজন মুমূর্ষু মানুষের চিকিৎসার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করাও মানবিক দায়িত্ব। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন অসহায় মানুষের মুখেও হাসি ফোটে।
ইসলামে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবগুলো আমাদের ত্যাগ, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। অথচ সমাজে যদি কোনো অসহায় হাফেজ, ইমাম কিংবা দরিদ্র মানুষ চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পান, তাহলে আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সমাজে ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় পরিচয়। কোনো ধর্মের অনুসারীদের উৎসবকে ছোট করে দেখা নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়—মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় মানবিক কাজ খুব কমই আছে।
জাকির হোসেনের মতো একজন অসহায় ক্যান্সার আক্রান্ত হাফেজ ও ইমামের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।
মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা অর্জনের সবচেয়ে বড় পথ হলো বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। নির্বাচনে জয়লাভ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা নেতৃত্বের পরিচয়ের চেয়েও অসহায় মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রাখা অনেক বেশি মূল্যবান।
আসুন, ধর্মীয় সম্প্রীতি অটুট রাখি, উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করি এবং মৃত্যুপথযাত্রী একজন অসহায় মানুষের চিকিৎসার জন্য সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসি। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা হোক আমাদের সবার মানবিক অঙ্গীকার।