
মাদকমুক্ত দেবিদ্বার উপজেলা ও পৌরসভা চাই……..এস এম ইমরান হাসান ;
মোঃ মাসুদ রানা
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি;
অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই দেবিদ্বার থানার পুলিশ প্রশাসনকে। দেবিদ্বার উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে আপনারা যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। মাদকের বিরুদ্ধে এই ধারাবাহিক অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত থাকুক—এটাই সচেতন মানুষের প্রত্যাশা।
আমাদের প্রত্যাশা একটাই—মাদকমুক্ত দেবিদ্বার উপজেলা ও পৌরসভা। শুভ হোক আগামীর বাংলাদেশ। নিরাপদ হোক আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশ বর্তমানে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মাদকাসক্তি, কিশোর অপরাধ, চুরি-ছিনতাই এবং সামাজিক অবক্ষয় ক্রমেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, মাদকের বিস্তার এখন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর ভয়াবহ ছোবল পৌঁছে যাচ্ছে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও।
যে বয়সে একটি কিশোরের হাতে থাকার কথা বই, খাতা ও কলম, যে বয়সে তার চোখে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সেই বয়সেই অনেক কিশোর নানা অপরাধচক্র ও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ চুরি-ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছে, কেউ মাদক সেবনে আসক্ত হচ্ছে, আবার কেউ মাদক ব্যবসায়ী চক্রের সহযোগী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি শিশুর এমন অধঃপতন শুধু তার নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর।
মাদক শুধু নেশা নয়, একটি সামাজিক বিপর্যয়
মাদক একটি ভয়ংকর নেশা। শুরুতে কৌতূহল, বন্ধুর প্ররোচনা কিংবা ভুল সঙ্গের কারণে কেউ মাদকের সংস্পর্শে আসতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই নেশাই তার স্বাভাবিক জীবনযাপন, পারিবারিক বন্ধন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে গ্রাস করতে শুরু করে।
মাদকের কারণে একটি পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে। অনেক সময় মাদকাসক্ত ব্যক্তি নেশার টাকা সংগ্রহ করতে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
এভাবেই মাদক ও কিশোর অপরাধ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করছে।
ছোটদের হাতে মাদক পৌঁছানো সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা
আমাদের এখনই প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে পারছি?
কিশোরদের হাতে যখন মাদক পৌঁছে যায়, তখন শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিক—সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
অভিভাবকদেরও আরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাড়ি ফিরছে, আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নজর রাখা প্রয়োজন।
কিশোর অপরাধ ঠেকাতে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে
শুধু একজন কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তাকে অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে কারা, কেন সে ভুল পথে যাচ্ছে এবং তার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ কেমন—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে।
কারণ, একটি কিশোরের অবসর যদি ভালো কাজে ব্যয় না হয়, তাহলে সেই শূন্যস্থান অনেক সময় অপরাধীচক্র ও মাদক ব্যবসায়ীরা পূরণ করার সুযোগ পায়।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান যেমন দরকার, তেমনি দরকার সামাজিক প্রতিরোধ
মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন। মাদক সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা সরবরাহ করছে এবং কোন পথে তা ছড়িয়ে পড়ছে—সেই নেটওয়ার্কও চিহ্নিত করা জরুরি।
তবে শুধু গ্রেপ্তার ও অভিযানই শেষ কথা নয়। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একজন মাদকাসক্ত তরুণকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা মানে একটি পরিবারকে রক্ষা করা।
দেবিদ্বারে সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা প্রশংসনীয়
মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গোমতী মাদকবিরোধী ও সমাজ উন্নয়ন সংগঠন মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচার, অভিভাবক সমাবেশ এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
দেবিদ্বার থানার পুলিশ প্রশাসনের চলমান মাদকবিরোধী তৎপরতার সঙ্গে সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষও যদি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন, তাহলে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হবে।
পুলিশের অভিযানকে সফল করতে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন
দেবিদ্বার উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসন যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার জন্য আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
তবে পুলিশের একার পক্ষে একটি পুরো উপজেলা মাদকমুক্ত করা সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা, নিজের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা এবং মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া—এগুলোও নাগরিক দায়িত্ব।
প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, মাদকবিরোধী অভিযানও তত বেশি কার্যকর হবে।
এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়
আজকের কিশোররাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের একটি অংশ যদি মাদকের ছোবলে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একটি পরিবারের নয়—পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের।
আমরা চাই না কোনো মায়ের বুক খালি হোক। কোনো বাবার স্বপ্ন ভেঙে যাক। কোনো পরিবার মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে অসহায় হয়ে পড়ুক।
একটি শিশুর হাতে মাদক নয়, বই তুলে দিতে হবে।
অপরাধের অন্ধকার নয়, আলোর পথ দেখাতে হবে।
অসুস্থ নেশা নয়, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার সুযোগ দিতে হবে।
আমাদের সম্মিলিত প্রত্যয় হোক—
মাদককে না বলুন।
কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখুন।
সন্তানদের সময় দিন।
মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
আমরা চাই মাদকমুক্ত দেবিদ্বার উপজেলা ও পৌরসভা।
শুভ হোক আগামীর বাংলাদেশ।
নিরাপদ হোক আমাদের কিশোর-তরুণ প্রজন্ম।
আজ একটি সন্তানকে রক্ষা করা মানে আগামী দিনের একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি বাংলাদেশকে রক্ষা করা।