মাসুদুর রহমান, জামালপুর প্রতিনিধি :
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার আদ্রা আব্দুল মান্নান উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাল সনদ ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতার সনদ ছাড়াই প্রায় ১৬ বছর ধরে শিক্ষকতা করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক হলেন গ্রন্থাগারিক শাহ নাজ পারভীন (ইনডেক্স নাম্বার: ডি১০৫৪০৮০)। সম্প্রতি শাহ নাজ পারভীনের উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে আবেদনটি বাতিল হবে বলে শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ১১ টায় জানিয়েছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদুর রহমান ভূঁইয়া।
স্থানীয় ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামীলীগ সরকারের সময় স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ২০১০ সালের ২৬ জুন ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শাহ নাজ পারভীন গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ পান। নিয়োগের সময় তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদ জমা দেন। ২০১৬ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও হাইকোর্টের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে ২০০৬ সালের পর এবং অননুমোদিত আউটার ক্যাম্পাস থেকে নেওয়া সনদ দিয়ে চাকরি বা এমপিওভুক্তির সুযোগ বর্তমানেও নেই ৷ ২০০৬ সালের পর দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত সনদগুলো অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্টের রায় ও ইউজিসি। সেই সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশাসনিক আলোচনা শুরু হলে ২০২৬ সালে তিনি বগুড়ার সিট ফাউন্ডেশন থেকে ২০১৩ সালের ডিপ্লোমা ইন লাইব্রেরি সায়েন্স অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি কোর্সের একটি সনদ জমা দিয়েছেন। সনদে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছর মেয়াদি কোর্সের উল্লেখ রয়েছে। অথচ ওই সময় বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে বেতন উত্তোলনের তথ্য থাকায় সনদটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই সনদ মুলেই গত ২৭ সেপ্টেম্বর শাহ নাজ পারভীনের উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তার সনদ যাচাই এবং নিয়োগের বৈধতা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন বাতিল করে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাই বাচাই করে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবী জানিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সেবা বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
এদিকে স্থানীয় সবুজ জানান,এই জাল সনদধারী শিক্ষক এ পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা বাবদ যে পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছেন, তা দ্রুত সরকারি কোষাগারে ফেরত নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে অব্যাহতি প্রদান করা হোক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, তিনি শিক্ষক ও স্টাফদের সাথে অধিকাংশ সময় খারাপ ব্যবহার করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তথ্য ভুল দিয়ে জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়েছেন। পরে ২০২৬ সালে তিনি আরেকটি সনদ এনেছেন বগুড়ার সিট ফাউন্ডেশন থেকে। ২০১৩ সালে তিনি কোন ছুটি নেয়নি বরং বিদ্যালয় থেকে বেতন উত্তোলন করেছেন। এখানেও উপস্থিত আবার সিট ফাউণ্ডেশন উপস্থিত থেকে কোর্স করা এটা হাস্যকর। কাজেই বুঝা যাচ্ছে তিনি কারো সেই সনদ চাকুরী বাচাতে বানিয়ে এনেছেন৷ দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা ও পাশাপাশি সিট ফাউন্ডেশনের সনদ দিয়ে উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন বাতিল করে তাকে দ্রুত অব্যাহতির দাবী জানান তারা৷
উল্লেখ্য যে, ও আইসিটি বিভাগের শিক্ষক নাসিমা আক্তার (ইনডেস্ক নাম্বার :ডি১০৫৯০২১) সনদ দেখাতে না পারায় নাসিমা আক্তারকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন । আরেক সহকারী শিক্ষক ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সদস্য গোলাম মোস্তফা ( এন১১৩৬৪৮৬) বিরুদ্ধেও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি না থেকে কোচিং সেন্টারে সময় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে৷
তবে শাহ নাজ পারভীন দাবি করেন, তার সনদ সঠিক এবং তিনি সিট ফাউন্ডেশনের একটি নতুন সনদ জমা দিয়েছেন। একই বছরে বিদ্যালয়ে উপস্থিত আবার কোর্স এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, আপনার নাম্বার দিয়ে যান, পরে ফোনে আপনার সাথে যোগাযোগ করব।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন বলেন, “ সনদ মুলেই উচ্চতর স্কেল ও টাইম স্কেলের আবেদন পাঠানো হয়েছে। সনদটি জাল নাকি সঠিক সেটা আমরা যাচাই করতে পারি না। যদি সেই সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠে তাহলে যাচাই করা প্রয়োজন।
মেলান্দহ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদুর রহমান ভূঁইয়া জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সীট ফাউন্ডেশন এর সনদ হবে না। সেটা আমরা নোট দিয়ে দিচ্ছি । সেটা যাচাই বাচাই এর পর বাতিল হবে।
জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শামছুল আলম কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জিন্নাতুল আরা,সনদ ভুয়া প্রমাণিত হলে পরে উচ্চতর ও টাইম স্কেলের আবেদন পাঠানোর সুযোগ নেই। দারুল ইহসান এর সার্টিফিকেট বাতিল হলে তো ওনার নিয়োগই বাতিল হবে। আর এক সাথে এক জায়গায় শিক্ষকতা আবার আরেক স্থানে ছুটি ব্যতীত কোর্স করারও সুযোগ নেই। চাইলেও এক সাথে দুই জায়গায় সম্ভব না। আমি খোজ নিচ্ছি।
মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন ও সংস্থাপন) মোঃ রাজিবুল আলম মুঠোফোনে জানান, উপজেলা ও জেলা কর্মকর্তার সাথে কথা বলেন৷ আর আবেদন পাঠিয়ে দিয়ে থাকলে মাধ্যমিক অনুবিভাগ-২ এটা দেখবে৷
মাসুদুর রহমান
০১৯৭৮৫০৫২৪৪