
মোহাম্মদ মাসুদ রানা, কুমিল্লা
সময় ফুরিয়ে আসছে—কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই ছুটে চলা জীবনের হিসাবটা আমরা কীভাবে মেলাই? জীবন কখনো থেমে থাকে না। সময়ের স্রোতও কারও জন্য অপেক্ষা করে না। অথচ আমরা প্রতিদিনের ব্যস্ততায় এমনভাবে ছুটে চলি, যেন সামনে পড়ে আছে অনন্তকাল।
আমাদের শৈশব কিংবা কৈশোরের বাসাটি ছিল চারতলা। তখন দিনে কতবার যে সেই সিঁড়ি দিয়ে ওপর-নিচ করেছি, তার কোনো হিসাব ছিল না। হুড়মুড় করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া, আবার দৌড়ে নিচে নেমে আসা—সবই ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তখন কে ভেবেছিল, এই ছোট্ট সিঁড়িটিই একদিন জীবনের বড় এক দর্শন হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়াবে?
জীবনের কোনো এক বাঁকে এসে হঠাৎ টের পাওয়া যায়—সেই অবলীলায় সিঁড়ি ভাঙার শক্তি আর শরীরে নেই।
আজ চারতলার ফ্ল্যাটে উঠতে গিয়ে যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখন অজান্তেই মনে দোলা দেয় এক অচেনা শূন্যতা। মনে হয়, এই তো সেদিনও সময় ছিল অফুরান। তারুণ্যের শক্তির যেন কোনো শেষ ছিল না। অথচ প্রতিদিন না জেনেই যে সিঁড়িগুলো পেরিয়ে এসেছি, আজ বয়সের ভারে সেই ধাপগুলোই কেমন কঠিন মনে হয়।
জীবন এভাবেই নীরবে তার পাতা উল্টে দেয়। আমরা টেরও পাই না—কখন যৌবনের দৃঢ় দেয়ালে বয়সের প্রথম ফাটল ধরে, কখন চুলে রুপালি আভা নামে, কখন আয়নায় চেনা মুখটির ওপর অচেনা বয়সের ছাপ পড়ে।
সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যেন জীবনের একেকটি অধ্যায়। কোনো ধাপে শৈশব, কোনো ধাপে কৈশোর, কোথাও তারুণ্য, কোথাও সংসার, দায়িত্ব আর সংগ্রাম। একসময় ওপরে ওঠার তাড়নায় ক্লান্তি আমাদের স্পর্শ করত না। সামনে ছিল স্বপ্ন, লক্ষ্য আর অসংখ্য সম্ভাবনা।
আজ সেই একই সিঁড়িতে পা ফেলতে গিয়ে যখন হাঁটু কেঁপে ওঠে, তখন নিচতলার সেই চিরচেনা দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয়, জীবনটা আসলে কত দ্রুত তার অন্তিম অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!
চোখের পলকে কেটে যায় বছর। যে মানুষটি একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখত, একদিন সেই মানুষটিই আয়নায় নিজের অতীতের মুখ খুঁজতে থাকে।
এই যে মুহূর্তগুলো হাত ফসকে গলে যাচ্ছে—এর পেছনে কি কোনো গভীর অনুশোচনা আছে? নাকি এটাই প্রকৃতির নির্মম অথচ চিরন্তন নিয়ম?
আমরা সময়ের পেছনে ছুটতে ছুটতে কখন যে ভুলে যাই—সময়ও নীরবে আমাদের পেছনে ছুটছে। ক্যারিয়ার, অর্থ, ব্যস্ততা, সামাজিক অবস্থান আর বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতায় আমরা এমন এক মায়াজালে আটকে পড়ি যে, একসময় পেছনে ফিরে তাকানো ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
তখন মনে পড়ে যায় ফেলে আসা সেই সোনালি দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে শৈশবের হাসি, কৈশোরের দুরন্তপনা, প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো বিকেল, হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর ফিরে না আসা অসংখ্য মুহূর্ত।
এই সিঁড়িগুলো শুধু ইট-পাথরের তৈরি নয়—এগুলো আমাদের বেড়ে ওঠার নীরব সাক্ষী। আমাদের পাওয়া-না পাওয়ার গল্প, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-ভাঙা ও নতুন করে স্বপ্ন দেখার ইতিহাস যেন লুকিয়ে আছে প্রতিটি ধাপে।
একদিন হয়তো এই চারতলার সিঁড়িগুলো আর আমাদের চেনা থাকবে না। হয়তো পৃথিবীর ধুলোয় আমাদের পদচিহ্নও একসময় মুছে যাবে। কিন্তু প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো, ভালোবাসার স্মৃতি আর হৃদয়ে জমে থাকা অমলিন অনুভূতিগুলো হয়তো থেকে যাবে—কোনো না কোনো মানুষের স্মৃতিতে, কোনো গল্পের ভাঁজে, কিংবা প্রকৃতির নীরব বুকের ভেতর।
জীবন সত্যিই কঠিন। আবার একই সঙ্গে অদ্ভুত এক রহস্যময় মায়ায় ঘেরা। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে আমরা সবাই একদিন না একদিন শেষ ধাপটির কাছে পৌঁছে যাব।
তাই ফুরিয়ে আসার আগে জীবনটাকে একটু অনুভব করা দরকার। ব্যস্ততার ভিড়ে প্রিয় মানুষটিকে একটু সময় দেওয়া দরকার। অভিমান জমিয়ে না রেখে ভালোবাসার কথাটি বলে ফেলা দরকার। কারণ সময় চলে গেলে সিঁড়ির ধাপগুলো হয়তো আবার সামনে থাকবে, কিন্তু ফিরে আসবে না সেই মানুষগুলো, সেই দিনগুলো, সেই মুহূর্তগুলো।
শেষ পর্যন্ত হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্পদ নয়, পদ-পদবি নয়—বরং আমরা কতটা ভালোবাসা দিয়ে গেছি, কতগুলো হৃদয়ে নিজের জন্য একটি সুন্দর স্মৃতি রেখে যেতে পেরেছি।
সময়ের সিঁড়ি বেয়ে আমরা সবাই এগিয়ে চলেছি। কেউ দ্রুত, কেউ ধীরে। কিন্তু গন্তব্য সবারই এক।
ফুরিয়ে আসার এই বেলায় তাই প্রশ্ন একটাই—শেষ ধাপে পৌঁছানোর আগে, জীবনকে আমরা সত্যিই কতটা বাঁচতে পেরেছি?